মক্কার ব্যস্ত নগরজীবন, সুউচ্চ হোটেল, ফ্লাইওভার আর মানুষের ভিড়ে মুখর রাস্তার মাঝেই রয়েছে একটি ছোট্ট নীরব জায়গা। চারদিকে আধুনিক স্থাপনা গড়ে উঠলেও জায়গাটির একটি অংশ এখনো খালি পড়ে আছে। ইতিহাসবিদদের মতে, এই নীরব ভূমির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরবের জাহেলি যুগের এক নির্মম অধ্যায়—যেখানে কন্যা শিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথা প্রচলিত ছিল।
মসজিদুল হারামে যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে অবস্থিত এই জায়গাটি আজও অনেকের কাছে ইতিহাসের এক গভীর স্মারক। আধুনিক নগরায়ণের মাঝেও কেন জায়গাটি ফাঁকা—এই প্রশ্ন অনেকের মনে জাগে। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, ইসলামপূর্ব যুগে আরব সমাজের কিছু গোত্রের মধ্যে কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকে অপমান ও বোঝা হিসেবে দেখা হতো। সামাজিক লজ্জা, দারিদ্র্য এবং গোত্রীয় অহংকারের কারণে তারা অনেক সময় নিষ্ঠুরভাবে নবজাতক কন্যাদের জীবন্ত মাটিচাপা দিয়ে দিত।
পবিত্র কোরআনেও এই বর্বর প্রথার কথা উল্লেখ রয়েছে। সুরা আন-নাহলের ৫৮ ও ৫৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সংবাদ দেওয়া হতো, তখন তার মুখ কালো হয়ে যেত এবং সে দুঃখে ক্লিষ্ট হয়ে পড়ত। সে ভাবত, অপমান সহ্য করে সন্তানকে রাখবে, নাকি মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে।
ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। বনি তামিম গোত্রের প্রধান কায়েস ইবনে আসেম ইসলাম গ্রহণের পর একবার নবী করিম (সা.)-এর সামনে নিজের জীবনের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা বলেন। তিনি স্বীকার করেন, জাহেলি যুগে তিনি নিজের হাতেই তার একটি কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন। মেয়েটি তখন অসহায়ভাবে ‘বাবা… বাবা…’ বলে ডাকছিল। এই বর্ণনা শুনে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) গভীরভাবে ব্যথিত হন এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।
ইসলামের আগমনের পর এই নিষ্ঠুর প্রথা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ইসলাম কন্যা সন্তানকে বোঝা নয়, বরং আল্লাহর রহমত হিসেবে ঘোষণা করে। নারীর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইসলাম সুস্পষ্ট বিধান দেয়। মা, কন্যা ও স্ত্রী—এই তিন পরিচয়েই নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে ইসলামের শিক্ষা।
আজ সেই নীরব জায়গায় দাঁড়ালে ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতার কথা মনে পড়ে। একই সঙ্গে মনে পড়ে যায় মানবতার এক বড় পরিবর্তনের গল্প— যেখানে অন্ধকারাচ্ছন্ন এক সমাজকে আলোর পথে নিয়ে আসে ইসলাম। সেই খালি জমি তাই শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি মানবতার ইতিহাসে নিষ্ঠুরতা থেকে করুণা এবং অবহেলা থেকে সম্মানের পথে যাত্রার এক নীরব সাক্ষী।