চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যারা কেবল মেধা দিয়ে নয়, বরং অদম্য জেদ আর মানবিকতা দিয়ে বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন। ডা. হেলেন টাউসিগ ছিলেন তেমনই একজন নারী। যিনি নিজে কানে শুনতে পেতেন না, যার পড়তে সমস্যা হতো, অথচ তিনি শুনতে পেয়েছিলেন নীল হয়ে যাওয়া মুমূর্ষু শিশুদের হৃদস্পন্দনের সেই করুণ আর্তি।
প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে
হেলেন টাউসিগের ছোটবেলাটা আর পাঁচটা সাধারণ শিশুর মতো সহজ ছিল না। গুরুতর ডিসলেক্সিয়ার কারণে বইয়ের পাতাগুলো তার কাছে ছিল এক গোলকধাঁধা। অক্ষরগুলো যেন চোখের সামনে নাচত। যখন তিনি বড় হলেন এবং ডাক্তারি পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন প্রকৃতি তাকে আরও এক কঠিন পরীক্ষায় ফেলল। ২০ বছর বয়সের দিকে তিনি শ্রবণশক্তি হারাতে শুরু করেন। কিন্তু হেলেন দমে যাননি; তিনি ঠোঁট দেখে কথা বলা (Lip-reading) রপ্ত করলেন এবং নিজের মেধা দিয়ে জয় করলেন সব বাধা।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদ
১৯২০-এর দশকে চিকিৎসাবিদ্যায় নারীর পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল তাকে ক্লাসে বসার অনুমতি দিলেও ডিগ্রি দিতে অস্বীকার করে। বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে তাকে পুরুষ সহপাঠীদের থেকে দূরে পেছনের সারিতে বসতে বাধ্য করা হতো এবং তাদের সাথে কথা বলাও বারণ ছিল। এই অদৃশ্য দেয়াল তাকে দমাতে পারেনি। ১৯২৭ সালে তিনি জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজির জগতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেন।
‘ব্লু বেবি’ ও এক ঐতিহাসিক আবিষ্কার
সেই সময়ে অনেক শিশু হৃদযন্ত্রের জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাত, যাদের শরীরে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছাত না। ফলে শিশুদের গায়ের রঙ নীল হয়ে যেত এবং তারা করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। চিকিৎসকরা বলতেন, “কিছুই করার নেই।” কিন্তু হেলেন জানতেন, পথ একটি আছে। তিনি প্রস্তাব করেন রক্তপ্রবাহের দিক পরিবর্তন করে ফুসফুসে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ানোর।
সার্জন অ্যালফ্রেড ব্ল্যালক এবং দক্ষ টেকনিশিয়ান ভিভিয়ান থমাস-এর সাথে মিলে ১৯৪৪ সালে তিনি প্রথম সফলভাবে ‘ব্ল্যালক-টাউসিগ শান্ট’ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। আইলিন স্যাক্সন নামের এক মুমূর্ষু শিশু এই অস্ত্রোপচারের পর নীল থেকে সুস্থ গোলাপী বর্ণ ধারণ করে। এটি ছিল আধুনিক পেডিয়াট্রিক হার্ট সার্জারির এক যুগান্তকারী মুহূর্ত।
একটি নিরাপদ পৃথিবীর অতন্দ্র প্রহরী
হেলেন টাউসিগ কেবল শিশুদের হৃদরোগ নিয়েই থেমে থাকেননি। ১৯৬০-এর দশকে ইউরোপে যখন থ্যালিডোমাইড নামক একটি ওষুধের কারণে হাজার হাজার শিশু শারীরিক বিকৃতি নিয়ে জন্মাচ্ছিল, তখন তিনিই প্রথম এর ভয়াবহতা বুঝতে পারেন। তার সতর্কবার্তার কারণেই আমেরিকায় এই ওষুধ নিষিদ্ধ হয় এবং রক্ষা পায় অসংখ্য অনাগত প্রাণ।
অর্জিত সম্মান ও উত্তরসূরিদের অনুপ্রেরণা
কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি আমেরিকার সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম’ অর্জন করেন। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নারী অধ্যাপক হিসেবে তিনি নারী জাগরণের মূর্ত প্রতীক হয়ে ওঠেন।
ডা. হেলেন টাউসিগের জীবন আমাদের শেখায় যে, সীমাবদ্ধতা আসলে মনের ভেতরে। যিনি নিজে পড়তে পারতেন না, তিনি পড়েছিলেন হৃদয়ের গভীর ভাষা। যিনি শুনতে পেতেন না, তিনি শুনিয়েছেন হাজারো শিশুর বাঁচার গান।
তথ্যসূত্র: ওমেন হিস্ট্রি ডট ওআরজি (WomenHistory.org) এবং জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি আর্কাইভ।