Monday 09 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মেক্সিকোর রহস্যময় পুতুলের দ্বীপ যেনো এক ভয়াল সৌন্দর্যের মায়াজাল

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৯ মার্চ ২০২৬ ২০:১০

মেক্সিকো সিটির কোলাহল ছেড়ে দক্ষিণে জলপথ ধরে এগোলে জোচিমিলকো খালের শান্ত আবহ আপনাকে মুগ্ধ করবে। রঙিন ‘ত্রাজিনেরা’ নৌকায় চড়ে ভেসে চলার সময় চারপাশের সবুজ প্রকৃতি চোখের আরাম দেয়। কিন্তু এই প্রশান্তির মাঝেই লুকিয়ে আছে এক রোমহর্ষক বিস্ময়, যা পর্যটকদের মনে একই সাথে ভয় এবং কৌতূহল জাগিয়ে তোলে। আমরা কথা বলছি ‘ইসলা দে লাস মুনেকাস’ বা পুতুলের দ্বীপ নিয়ে। একজন আন্তর্জাতিক ফিচার লেখক ও পরিব্রাজক হিসেবে আমি যখনই এই দ্বীপে পা রেখেছি, তখনই মনে হয়েছে সময় এখানে থমকে আছে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা আর রহস্যকে সঙ্গী করে।

জুলিয়ান সান্তানা বারেরার সেই অদ্ভুত সংকল্প

এই দ্বীপের গল্পের শুরুটা কোনো ভৌতিক চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্টের চেয়ে কম নয়। ডন জুলিয়ান সান্তানা বারেরা নামের এক ব্যক্তি ছিলেন এই গল্পের মূল কারিগর। ১৯৫০-এর দশকে তিনি তার পরিবার ছেড়ে মেক্সিকো সিটির উপকণ্ঠে এই নির্জন দ্বীপে আশ্রয় নেন। লোককথা অনুযায়ী, দ্বীপে আসার কিছুকাল পরেই জুলিয়ান খালের পানিতে একটি ছোট মেয়ের মৃতদেহ ভেসে আসতে দেখেন। মেয়েটিকে বাঁচাতে না পারার অনুশোচনা এবং তার আত্মার শান্তি কামনায় তিনি খালের জলে ভাসমান একটি পুতুল তুলে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেন। জুলিয়ান বিশ্বাস করতেন, এই পুতুলগুলো মৃত মেয়েটির অতৃপ্ত আত্মাকে শান্ত রাখবে এবং দ্বীপটিকে অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করবে।

বিজ্ঞাপন

গাছের ডালে ঝুলন্ত হাজারো নির্নিমেষ দৃষ্টি

পুতুলের দ্বীপে পা রাখলে প্রথমেই আপনার চোখে পড়বে কয়েক হাজার পুতুল, যারা গাছের ডাল, দেয়াল কিংবা ঝোপঝাড়ের সাথে তার দিয়ে বাঁধা অবস্থায় ঝুলে আছে। বছরের পর বছর রোদ, বৃষ্টি আর কুয়াশায় ভিজে এই পুতুলগুলোর অবস্থা এখন বেশ করুণ। অনেকেরই হাত-পা নেই, কারো চোখ নেই, আবার কারো শরীর থেকে প্লাস্টিক খসে পড়ছে। এই দৃশ্যটি দিনের বেলাতেও বেশ গা ছমছমে। কিন্তু একজন গবেষক হিসেবে আমি দেখেছি, এই পুতুলগুলো কেবল ভয় দেখানোর বস্তু নয়, বরং এগুলো একেকটি সময়ের সাক্ষী। জুলিয়ান তার জীবনের প্রায় ৫০ বছর ব্যয় করেছেন এই পুতুলগুলো সংগ্রহ করতে। তিনি আবর্জনা থেকে পুতুল খুঁজে আনতেন কিংবা তার বাগানের সবজির বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে পুরনো পুতুল নিতেন।

রহস্যের ঘনঘটা এবং খালের সেই জলরাশি

স্থানীয়দের মধ্যে এই দ্বীপ নিয়ে নানা মুখরোচক গল্প প্রচলিত আছে। কেউ বলেন, রাতের অন্ধকারে পুতুলগুলো নিজেদের মধ্যে কথা বলে, আবার কেউ দাবি করেন পুতুলগুলো তাদের চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। তবে বিজ্ঞানের চোখে দেখলে, এগুলো কেবলই মানুষের মনের ভ্রম। প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি এই কাজ চালিয়ে যান। কিন্তু ২০০১ সালে ঘটে ট্র্যাজেডি, ডন জুলিয়ানও মারা যান সেই একই খালে, যেখানে শিশুটি ডুবে মারা গিয়েছিল।। তার মৃত্যুর কারণ ছিল হৃদরোগ, কিন্তু স্থানটির কাকতালীয় মিল মানুষের মনে রহস্যের দানা আরও ঘনীভূত করে দেয়। এরপর থেকেই দ্বীপটি বিশ্বের অন্যতম রহস্যময় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ভয়কে জয় করে পর্যটনের নতুন ঠিকানা

বর্তমানে এই দ্বীপটি মেক্সিকোর অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। যদিও সরকারিভাবে এটি কোনো স্বীকৃত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি, তবুও হাজার হাজার সাহসী পর্যটক প্রতি বছর এখানে ভিড় জমান। নৌকায় করে যাওয়ার সময় খালের দুপাশের জঙ্গল আর কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ এক অপার্থিব অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। যারা রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাদের কাছে এটি স্বর্গের মতো। পুতুলের দ্বীপটি প্রমাণ করে যে, সৌন্দর্য সবসময় কেবল ফুলে-ফলে ভরা বাগানে থাকে না, কখনো কখনো তা ভাঙা ডানা আর একজোড়া নির্জীব চোখের চাউনিতেও খুঁজে পাওয়া যায়। এটি মূলত এক নিঃসঙ্গ মানুষের শোক প্রকাশের এক বিমূর্ত শিল্পকলা।

শৈশব আর স্মৃতির এক করুণ মেলবন্ধন

পুতুলের দ্বীপ আমাদের শৈশবের সবচেয়ে প্রিয় খেলনাটিকে এক ভিন্নরূপে উপস্থাপন করে। যে পুতুলটি একসময় কোনো শিশুর ড্রয়িংরুমে রাজত্ব করত, আজ সেটি শেওলা ধরা অবস্থায় একটি নিঃসঙ্গ দ্বীপে ঝুলছে। এটি জীবনের নশ্বরতাকেই যেন ফুটিয়ে তোলে। দ্বীপটি ভ্রমণ শেষে ফেরার পথে আপনার মনে বারবার এই প্রশ্নটিই জাগবে—জুলিয়ান কি সত্যিই কোনো আত্মাকে শান্ত করতে চেয়েছিলেন, নাকি নিজের নিঃসঙ্গতাকে কাটানোর জন্য এই বিশাল পুতুল বাহিনীকে গড়ে তুলেছিলেন? রহস্য যাই হোক না কেন, ‘ইসলা দে লাস মুনেকাস’ চিরকাল মানুষের মনে বিস্ময় আর ভয়ের এক দোলাচল তৈরি করে যাবে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর