Wednesday 04 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সাহারার বুক চিরে চলা লৌহ দানব: মরিশানিয়া এক্সপ্রেসের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৪ মার্চ ২০২৬ ১৭:৪৪

সাহারা মরুভূমির দিগন্তজোড়া তপ্ত বালুরাশির ওপর দিয়ে যখন এটি চলতে শুরু করে, তখন ওপর থেকে দেখলে মনে হয় এক বিশালকার কৃষ্ণকায় অজগর সাপ ধীরলয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে চলেছে। বালুঝড় আর তপ্ত রোদের আঁচ গায়ে মেখে এই দানবীয় আকৃতির ট্রেনটি যখন আপনার চোখের সামনে দিয়ে অতিক্রম করবে, তখন এর শেষ মাথা দেখতে আপনাকে হয়তো টানা ২০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এটি কোনো সাধারণ ট্রেন নয়, এটি হলো মরিশানিয়া এক্সপ্রেস— যাকে বলা হয় পৃথিবীর দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে ভারী ট্রেনগুলোর একটি। সাহারার নির্জনতাকে চিরে দিয়ে এটি প্রতিদিন বয়ে নিয়ে যায় হাজার হাজার টন আকরিক লোহা আর কিছু দুঃসাহসী মানুষের স্বপ্ন।

বিজ্ঞাপন

তপ্ত মরুর বুকে দীর্ঘতম মানচিত্র

মরিশানিয়ার সাহারা মরুভূমির বুক চিরে প্রায় ৭০৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় এই ট্রেনটি। এর দৈর্ঘ্য সাধারণত আড়াই কিলোমিটারের কাছাকাছি হয়, যেখানে বগির সংখ্যা প্রায় ২০০টি ছাড়িয়ে যায়। চার থেকে পাঁচটি শক্তিশালী লোকোমোটিভ ইঞ্জিন যখন এই বিশাল ভার টানতে শুরু করে, তখন মরুভূমির নির্জনতায় এক অদ্ভুত যান্ত্রিক সংগীতের সৃষ্টি হয়। সাহারার যে অংশে মানুষের পা রাখা প্রায় অসম্ভব, সেখানে এই ট্রেনটিই একমাত্র যোগসূত্র। এটি মূলত একটি মালবাহী ট্রেন হলেও এর মাহাত্ম্য কেবল পণ্য পরিবহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন সাহারা মরুভূমির এক অবিচ্ছেদ্য পরিচয়ে পরিণত হয়েছে।

আকরিক লোহার সওয়ারি ও জীবন সংগ্রাম

এই ট্রেনের মূল কাজ হলো উত্তর মরিশানিয়ার জুয়েরাত খনি থেকে উত্তোলিত ১৬ হাজার টনেরও বেশি আকরিক লোহা আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী নুয়াদিবু বন্দরে পৌঁছে দেওয়া। ১৬ থেকে ২০ ঘণ্টার এই দীর্ঘ যাত্রায় ট্রেনটি প্রচণ্ড তাপমাত্রার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। দিনের বেলায় সূর্যের প্রখর তাপে যখন বালি ফুটতে শুরু করে, তখন এই ট্রেনের লোহার বগিগুলো হয়ে ওঠে আগুনের পিণ্ড। আবার রাতে মরুভূমির হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় সেই একই বগিগুলো বরফের মতো শীতল হয়ে যায়। এই বৈরী পরিবেশকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েই বছরের পর বছর ধরে মরিশানিয়ার অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে এই লৌহ দানব।

টিকে থাকার লড়াই ও সাহারা ভ্রমণের রোমাঞ্চ

মরিশানিয়া এক্সপ্রেসের সবচেয়ে অবাক করা দিক হলো এর যাত্রীসেবা। যদিও এটি মূলত মালবাহী ট্রেন, কিন্তু এর পেছনে দু-একটি সাধারণ যাত্রীবাহী বগি যুক্ত থাকে। তবে স্থানীয়দের একটি বড় অংশ টিকিট ছাড়াই আকরিক লোহার ওপর বসে কিংবা বগির ভেতরে খালি জায়গায় চড়ে যাতায়াত করেন। চোখে চশমা আর মুখে স্কার্ফ জড়িয়ে ধুলোবালি থেকে বাঁচতে বাঁচতে তারা পাড়ি দেন শত শত মাইল। পর্যটকদের কাছে এটি এখন বিশ্বের অন্যতম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। এক টিকিটেই গোটা সাহারার বিশালতা দেখার এমন সুযোগ আর কোনো পথে মেলা ভার। মুক্ত আকাশের নিচে ধুলোমাখা শরীরে সাহারার নক্ষত্রখচিত রাত দেখার অভিজ্ঞতা যেকোনো দুঃসাহসী ভ্রমণপিপাসুর কাছে এক পরম পাওয়া।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর