ফেব্রুয়ারির শেষ প্রান্তে, যখন ঋতু বদলের ইশারা বাতাসে ভাসে, তখন কিছু দেশে রঙিন আয়োজনে পালিত হয় ফ্লোরাল ডিজাইন দিবস। ২৮ ফেব্রুয়ারি উদযাপিত এই দিনটি শুধু ফুলের সৌন্দর্যকে নয়, বরং ফুল সাজানোর শিল্পকে সম্মান জানায়। যে শিল্পে রঙ, গন্ধ, অনুভূতি আর সৃজনশীলতা মিলেমিশে এক অনন্য নান্দনিক অভিব্যক্তি তৈরি করে।
দিনটির পেছনের মানুষ
ফ্লোরাল ডিজাইন দিবস পালিত হয় প্রখ্যাত ফুল-নকশাকার Carl Rittner-এর জন্মদিনে। আধুনিক ফ্লোরাল ডিজাইন শিক্ষার অগ্রদূত হিসেবে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। ফুলকে কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। তার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রে ফ্লোরাল ডিজাইনকে পেশাগত মর্যাদা এনে দেয়। তাই তার জন্মদিনকে ঘিরেই দিনটি শিল্পের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
ফুলের কিছু ভাষা
ফুলের একটি নিজস্ব ভাষা আছে। লাল গোলাপ ভালোবাসার কথা বলে, সাদা লিলি পবিত্রতার, আর হলুদ টিউলিপ বন্ধুত্বের উজ্জ্বলতা ছড়ায়। ফ্লোরাল ডিজাইন এই ভাষাকে আরও পরিশীলিত করে তোলে। কোন ফুলের পাশে কোন রঙ, কোন উচ্চতা, কোন পাত্র— সবকিছু মিলিয়ে একটি গল্প তৈরি হয়। কখনও তা আনন্দের, কখনও স্মৃতির, কখনও আবার কৃতজ্ঞতার।
এই দিনে ফুলের দোকানগুলোতে বাড়তি ব্যস্ততা দেখা যায়। অনেকে প্রিয়জনকে চমকে দিতে একটি ছোট তোড়া কিনে নেন। আবার কেউ কেউ নিজ হাতে ফুল সাজিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করেন। এটি নিছক সাজসজ্জা নয়; এটি অনুভূতির প্রকাশ।
ঘর সাজানো থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ
ফ্লোরাল ডিজাইন একসময় ছিল ঘরোয়া শিল্প। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিয়ে, কর্পোরেট অনুষ্ঠান, ফ্যাশন শো এমনকি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতেও জায়গা করে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নানা শহরে এই দিনে ছোটখাটো প্রদর্শনী ও কর্মশালার আয়োজন করা হয়। নতুনরা শেখেন কীভাবে রঙের ভারসাম্য রাখতে হয়, কীভাবে ফুলের স্থায়িত্ব বাড়ানো যায়, কিংবা কীভাবে একটি সাধারণ ফুলদানি হয়ে উঠতে পারে শিল্পকর্মের কেন্দ্রবিন্দু।
ফুলের গন্ধ যেমন মন ভালো করে, তেমনি ফুল সাজানোর প্রক্রিয়াও মানসিক প্রশান্তি আনে। অনেকেই এটিকে এক ধরনের সৃজনশীল থেরাপি বলে মনে করেন। ব্যস্ত জীবনের ভিড়ে কয়েকটি তাজা ফুল নিয়ে সময় কাটানো যেন এক টুকরো শান্তির অবকাশ।
অর্থনীতি ও সৃজনশীলতার সেতুবন্ধন
ফ্লোরাল ডিজাইন কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, এটি একটি শক্তিশালী শিল্পখাতও। ফুলচাষি, আমদানিকারক, ডিজাইনার, খুচরা বিক্রেতা; অসংখ্য মানুষের জীবিকা জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। বিশেষ দিবসগুলোতে ফুলের চাহিদা বাড়ে, ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতি পায়। ফ্লোরাল ডিজাইন দিবস সেই শিল্পকে স্বীকৃতি দেওয়ারও একটি উপলক্ষ।
বাংলাদেশে প্রাসঙ্গিকতা
যদিও এটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দিবস, তবু ফুলের প্রতি ভালোবাসা তো সার্বজনীন। বাংলাদেশের বসন্ত, পহেলা ফাল্গুন কিংবা বইমেলা। সব জায়গাতেই ফুলের উপস্থিতি চোখে পড়ে। আমাদের দেশেও এখন পেশাদার ফ্লোরাল ডিজাইনের চাহিদা বাড়ছে। সামাজিক অনুষ্ঠান, কর্পোরেট আয়োজনে সৃজনশীল ফুলসজ্জা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই এই দিনটি আমাদের জন্যও অনুপ্রেরণার হতে পারে।
শেষকথা
ফ্লোরাল ডিজাইন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য কখনও ছোট বিষয় নয়। একটি ছোট তোড়া, একটি সাদামাটা ফুলদানি কিংবা জানালার পাশে রাখা কয়েকটি গাঁদা—সবই জীবনের ক্লান্তিতে রঙের ছোঁয়া এনে দিতে পারে। ২৮ ফেব্রুয়ারি তাই শুধু একটি দিবস নয়, এটি ফুলের ভাষায় বলা এক নীরব কিন্তু গভীর গল্প— যেখানে শিল্প, অনুভূতি ও মানবিকতা একসঙ্গে ফুটে ওঠে।