Thursday 26 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

একটি রূপকথা বলার দিন আজ

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:০০

এক দেশে ছিলো এক রাজা – এই পাঁচটি শব্দ শুনলেই শৈশবের সেই হারানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় যেখানে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী কথা বলত কিংবা পঙ্খিরাজ ঘোড়া ডানা ঝাপটে মেঘের রাজ্যে পাড়ি জমাত। আজ সেই জাদুর জগতে ফেরার দিন। প্রতি বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘বলুন একটি রূপকথা দিবস’ বা ‘টেল আ ফেইরি টেল ডে’। এটি কেবল শিশুদের রূপকথা শোনানোর দিন নয়, বরং হাজার বছরের পুরনো লোকগাঁথা এবং সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদকে নতুন করে চিনে নেওয়ার এক বিশেষ উপলক্ষ।

প্রাচীন ঐতিহ্যের এক পশলা বৃষ্টি

রূপকথা কোনো আধুনিক আবিষ্কার নয়। এর শিকড় ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের গভীর অরণ্যে। লোকসংস্কৃতিবিদদের মতে, অনেক জনপ্রিয় রূপকথার বয়স হাজার হাজার বছর। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’ বা ‘রামপেলস্টিল্টস্কিন’ এর মতো গল্পের কথা, যা কিমবদন্তি হয়ে মানুষের মুখে মুখে টিকে আছে দীর্ঘ সময় ধরে। আগেকার দিনে রূপকথা কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, এগুলো ছিল জ্ঞান ও নৈতিকতা শিক্ষার অন্যতম পাঠশালা। আগুনের পাশে বসে বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে গল্প শোনার সেই ধারা থেকেই মূলত আজকের এই দিবসের উৎপত্তি। মানুষের কল্পনাশক্তিকে উসকে দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার প্রেরণা জোগায় এই প্রাচীন গল্পগুলো।

বিজ্ঞাপন

কেন রূপকথার জন্য আলাদা দিন

রূপকথা শুধু শিশুদের ঘুমপাড়ানি গল্প নয়; এগুলো মানবসভ্যতার প্রাচীন মৌখিক ঐতিহ্যের অংশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোককথা, উপকথা ও রূপকথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। পরে সেগুলো সংকলন করেন নানা দেশের লেখক ও গবেষক। ইউরোপে যেমন গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয় লোককথা সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ করেন, তেমনি ডেনমার্কে হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন রচনা করেন কালজয়ী রূপকথা। এসব কাজ রূপকথাকে পারিবারিক আড্ডা থেকে বিশ্বসাহিত্যের অংশে পরিণত করে।

রূপকথা বলার দিন সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে মানুষ যেন আবার গল্প বলার সহজ আনন্দে ফিরে আসে—এটাই এ দিনের মূল ভাবনা।

কল্পনার শক্তি ও শেখার সুযোগ

রূপকথায় থাকে জাদু, রাজপ্রাসাদ, বন-জঙ্গল, ড্রাগন, পরী কিংবা কথা বলা প্রাণী। কিন্তু এসব অলৌকিক উপাদানের আড়ালে লুকিয়ে থাকে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক বার্তা ও মানবিক মূল্যবোধ। ভালো-মন্দের লড়াই, সাহস, সততা, সহানুভূতি—এসবই গল্পের ভেতর দিয়ে সহজভাবে পৌঁছে যায়।

শিশুদের ভাষা শেখা, শব্দভাণ্ডার বাড়ানো এবং মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়াতে গল্প বলার গুরুত্ব নিয়ে শিক্ষাবিদরা দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছেন। উচ্চস্বরে গল্প শোনানো পারিবারিক বন্ধনও মজবুত করে—কারণ এতে তৈরি হয় যৌথ অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি।

সংস্কৃতির বৈচিত্র্যে রূপকথার রূপান্তর

বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের রূপকথা সেই অঞ্চলের জলবায়ু, খাদ্যাভ্যাস এবং মানুষের জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটায়। ইউরোপের বনজঙ্গলে ভরা ভাইকিংদের গল্প থেকে শুরু করে আরবের তপ্ত মরুভূমির জিন-পরীর কিমবদন্তি—সবই নিজস্ব ঢঙে অনন্য। আমাদের বাংলার রূপকথাও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’র সেই লালকমল-নীলকমল কিংবা ডালিমকুমারের গল্পগুলো আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রূপকথা দিবসটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ভৌগোলিক সীমানা আলাদা হলেও মানুষের স্বপ্ন দেখার ভাষা এবং অশুভের বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তির জয়ের আকঙ্ক্ষা সবখানেই প্রায় এক।

প্রাপ্তবয়স্কদের জীবনে কল্পনার গুরুত্ব

অনেকেই মনে করেন রূপকথা কেবল শিশুদের জন্য, কিন্তু আদতে এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা। আধুনিক মনস্তত্ত্বে রূপকথার গুরুত্ব অপরিসীম। কাল্পনিক এই চরিত্রগুলোর মাধ্যমে মানুষ অবচেতন মনের ভয়, আশা এবং সাহসকে খুঁজে পায়। ড্রাগনের সাথে লড়াই করা আসলে জীবনের কঠিন পরিস্থিতির সাথে লড়াই করারই নামান্তর। এই বিশেষ দিনটি বড়দেরও সুযোগ করে দেয় প্রাত্যহিক জীবনের যান্ত্রিকতা ভুলে কিছুটা সময় কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে। এটি মানসিক চাপ কমিয়ে সৃজনশীলতাকে জাগ্রত করতে সাহায্য করে এবং আমাদের ভেতরের সেই কৌতূহলী শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখে।

যেভাবে পালিত হতে পারে এই দিনটি

এই দিনটি পালনের সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো বইয়ের তাক থেকে পুরনো কোনো গল্পের বই নামিয়ে পড়া। কোনো প্রিয়জনকে বা পরিবারের ছোট সদস্যদের নতুন কোনো গল্প শোনানোর মাধ্যমেও দিনটি সার্থক করা যায়। অনেকে আবার এই দিনে রূপকথার চরিত্রের মতো সেজে সময় কাটান কিংবা কাল্পনিক কোনো গল্পের নতুন কোনো মোড় নিয়ে ভাবনাচিন্তা করেন। প্রযুক্তির এই যুগে অডিও বুক বা পডকাস্টের মাধ্যমেও রূপকথার জগতে ভ্রমণ করা সম্ভব। মূল উদ্দেশ্য হলো গল্পের সেই চিরাচরিত মোহময় পরিবেশটিকে ক্ষণিকের জন্য হলেও জীবন্ত করে তোলা।

শেষ কথা

রূপকথা বলার দিন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—গল্প বলার ক্ষমতা মানুষকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। আগুনের পাশে বসে গল্প বলা থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল পর্দা – মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু গল্পের প্রয়োজন ফুরায়নি।

বিজ্ঞাপন

রাউটার রাখার সঠিক জায়গা
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৭:০৯

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর