Monday 20 July 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বাংলা সাহিত্যের জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের প্রয়াণ দিবস

এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক
১৯ জুলাই ২০২৬ ১৮:১১

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি আর কেউ নন, আমাদের সবার প্রিয় কথাসাহিত্যিক ও চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি। আজ তার প্রয়াণ দিবস। নিজের জনপ্রিয় গানেই তিনি লিখেছিলেন, ‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো এক বরষায়’। প্রকৃতিপ্রেমী এই মানুষের চলে যাওয়ার দিনটিও ছিল এক মেঘলা বর্ষার দিন। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সৃষ্টি কোটি বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান থাকবে।

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা উপন্যাস ও কথাসাহিত্যের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছিলেন। সত্তর ও আশির দশকে যখন সাধারণ মানুষ বইবিমুখ হয়ে পড়ছিল, তখন তিনি তার জাদুকরী লেখনী দিয়ে মধ্যবিত্ত সমাজকে আবার বইমুখী করেন। তার সৃষ্ট চরিত্র ‘হিমু’, ‘মিসির আলি’ কিংবা ‘শুভ্র’ তরুণ প্রজন্মের কাছে এক একটি উন্মাদনা হয়ে দাঁড়ায়। বইমেলায় তার নতুন বই আসা মানেই ছিল পাঠকদের দীর্ঘ লাইন আর উপচে পড়া ভিড়। তার সহজ-সরল অথচ হৃদয়স্পর্শী লেখার ভঙ্গি সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বিদগ্ধ সমালোচক সবাইকে সমানভাবে মুগ্ধ করেছিল। হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানো ছন্নছাড়া তরুণ ‘হিমু’ আর যুক্তি দিয়ে রহস্যভেদ করা মনস্তাত্ত্বিক চরিত্র ‘মিসির আলি’ বাংলা সাহিত্যের দুটি অন্যতম অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। বাঙালির পারিবারিক টানাপোড়েন, আবেগ, ভালোবাসা আর ছোট ছোট আনন্দ-বেদনাকে তিনি যেভাবে তুলে ধরেছেন, তা আর কোনো লেখক করতে পারেননি। বছর অমর একুশে বইমেলায় তার বইয়ের বিক্রি এবং পাঠকপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী, যা বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

শুধু লেখার টেবিলেই নয়, ক্যামেরার পেছনেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সমান সফল ও বৈপ্লবিক। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) তার রচিত ধারাবাহিক নাটকগুলো দেখার জন্য রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের জনপ্রিয়তার কথা আজও মানুষ সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করে। বিশেষ করে ‘কোথাও কেউ নেই’ নাটকের চরিত্র ‘বাকের ভাই’-এর ফাঁসি রদ করার জন্য তৎকালীন সময়ে রাজপথে মিছিল পর্যন্ত হয়েছিল, যা বিশ্ব টেলিভিশন ইতিহাসেই এক নজিরবিহীন ঘটনা। পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন এবং বাণিজ্যিক ধারার বাইরে গিয়ে দর্শকপ্রিয় সুস্থ ধারার সিনেমা উপহার দেন। তার নাটক মানেই ছিল জীবন্ত সংলাপ আর চমৎকার সব অভিনয়শিল্পীর সমাহার, যা প্রতিটি বাঙালি পরিবারকে টেলিভিশনের সামনে বসিয়ে রাখত। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’ এবং তার সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটু পুত্র কমলা’র মাধ্যমে তিনি ঢাকাই সিনেমাকে এক নতুন ও নান্দনিক রূপ দিয়েছিলেন। চলচ্চিত্র অঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন এবং আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হন।

গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় নুহাশ পল্লী আজও তার স্মৃতি বহন করে চলেছে। তার নিজ হাতে গড়ে তোলা এই নুহাশ পল্লীতেই চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন তিনি। প্রতি বছর বর্ষায় যখন কদম ফোটে কিংবা বৃষ্টি নামে, তখন ভক্তরা নুহাশ পল্লীর সেই লিচু তলায় ছুটে যান প্রিয় লেখককে স্মরণ করতে। অন্যদিকে ধানমন্ডির ‘দখিন হাওয়া’ ফ্ল্যাটটি, যেখানে বসে তিনি জীবনের শেষ দিনগুলোর অধিকাংশ কালজয়ী সৃষ্টি লিখে গেছেন, সেখানেও যেন আজ নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। ভক্তদের বিশ্বাস, এই মেঘলা বরষায় তিনি হয়তো সবার অলক্ষ্যে একবার ফিরে আসেন তার প্রিয় নুহাশ পল্লীর সবুজ প্রাঙ্গণে কিংবা দখিন হাওয়ার বারান্দায়।যেখানে লিচু গাছের ছায়ায় এই মহান ব্যক্তিত্ব শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন এবং প্রতিদিন শত শত ভক্ত সেখানে গিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। নুহাশ পল্লীতে তিনি দেশি-বিদেশি অসংখ্য ওষুধি এবং দুর্লভ গাছের বাগান করেছিলেন, যা তার প্রকৃতিপ্রেমের এক জীবন্ত দলিল। ২০১২ সালের আজকের দিনে তার এই মহাপ্রস্থান বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে যে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করেছে, তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর