একটি গান কি কেবল বিনোদন, নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? কোনো সুর কি পারে একটি বিপন্ন জাতির পরিচয় বদলে দিতে? অবাক করার মতো হলেও সত্যি যে, বাংলাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার একটি জনপ্রিয় গান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এক নিভৃত পল্লীর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আশার আলো হয়ে এসেছিল। দীর্ঘ চার দশক আগে গাওয়া সেই গানের কথাগুলোই আজ একটি হারানো ভাষার লিখিত রূপ বা বর্ণমালা তৈরির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার ভুটান সীমান্ত ঘেঁষে ছোট এক গ্রাম টোটোপাড়া। সেখানে বসবাস করে প্রাচীন আদিবাসী সম্প্রদায় ‘টোটো’। তাদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও দীর্ঘকাল কোনো বর্ণমালা ছিল না, ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ভাষাটি কেবল মুখেই রয়ে গিয়েছিল। লিখিত রূপ না থাকায় আধুনিকতার চাপে ভাষাটি যখন বিলুপ্তির পথে, ঠিক তখনই ত্রাতা হয়ে আসেন ধনীরাম টোটো। কিন্তু তার এই উদ্যোগের পেছনে ছিল রেডিওতে শোনা রুনা লায়লার সেই কালজয়ী কণ্ঠের জাদু।
ধনীরাম টোটো একদিন রেডিওতে শুনছিলেন— ‘তুমি আমি লিখি প্রাণের বর্ণমালা’। কবি শামসুর রাহমানের লেখা এবং খন্দকার নূরুল আলমের সুরে গাওয়া এই গানটি শুনে তার মনে এক গভীর দাগ কাটে। গানটির প্রতিটি কথা তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে যে, যদি সবার প্রাণের বর্ণমালা থাকতে পারে, তবে টোটোদের কেন থাকবে না? সেই এক পঙ্ক্তি গানের অনুপ্রেরণায় শুরু হয় তার দীর্ঘ গবেষণা ও সাধনা। যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নেয় ‘টোটো-হরফ’ বা ‘তোত্বিকো আল্লাবেত’। এই অসামান্য অবদানের জন্য পরবর্তীতে ভারত সরকার তাকে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানে ভূষিত করে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে দেশে ফিরে এই খবরটি জানতে পারেন শিল্পী রুনা লায়লা। দীর্ঘ ৪৫ বছর আগের একটি গান যে আজও অসীম শক্তির আধার হয়ে একটি বিপন্ন জাতিকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে, তা জেনে তিনি নিজেও আবেগপ্লুত। শিল্পীর মতে, এটিই ভালো গানের শক্তি। যখন কোনো সুর বা কথা একটি জাতির পরিচয় রক্ষার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি একজন শিল্পীর কাছে আর কিছুই হতে পারে না। আজ টোটোপাড়ার সেই নতুন বর্ণমালার প্রতিটি হরফে যেন মিশে আছে বাংলাদেশের সেই চিরচেনা সুরের প্রতিধ্বনি।