ঢাকা: মধ্যপ্রচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো নিজেদের সুরক্ষায় দশকের পর দশক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করে আসছে। কিন্তু এই নির্ভরতাই শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য বিপদের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান এসব দেশে ১৯টি মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্যে ছিল আরব দেশগুলোকে নিরপাত্তা দেওয়া। কিন্তু ইরান ও ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধে এসব ঘাঁটি আবর দেশগুলোকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে মারাত্মক হুমকি মুখে ফেলে দিয়েছে।
এই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আরবদের নিরাপত্তা কী দিবে, বরং নিজেরাই ইরানের হামলা থেকে বাঁচতে মার্কিন ঘাঁটি ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ১৯টি সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিকে যেখানে রক্ষা করতে পারেনি, সেখানে আরবদের নিরাপত্তা দেওয়ার বিষয়টি এখন চরম হাস্যকর বিষয় হয়ে গেছে। গত ৭০ থেকে ৭৫ বছর ধরে নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটি দিয়ে নিজেদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে আজ চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ঘাঁটি দেওয়ার বিনিময়ে টানা ৪০ দিন ধরে ইরানের মিসাইল সহ্য করতে হয়েছে আরবদের।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত টানা ৪০ দিন ইসরাইল-আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলো বড়ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১২০ থেকে ১৯৪ বিলিয়ন ডলার। একইসঙ্গে ইরানের ক্ষতির পরিমাণ ১৮ লাখ কোটি টাকা, যা নিজেরাই স্বীকার করেছে। অন্যদিকে মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ধারণা করা হচ্ছে ২০০ বিলিয়র ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই ধরনের ক্ষতির মুখে ইসরাইলও। কিন্তু ইরান, ইসরাইল কিংবা আমেরিকার আর্থিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি না হয় স্বাভাবিক। কারণ, তিনটি পক্ষই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে অথবা পড়তে বাধ্য হয়েছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করতে মিসাইল কিংবা বিমান হামলা করেছে। এতে করে উভয়পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলো কোনো ধরনের যুদ্ধে না জড়িয়ে কেবল আমেরিকাকে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে দেওয়ার কারণে তাদের আজ বড় ধরনের মাশুল দিতে হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, আরব দেশগুলো খাল কেটে কুমির এনেছিল নিজেদের রক্ষা করতে; কিন্তু সেই কুমিরই আজ তাদের সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করছে, অর্থনীতি ধবংস করছে।
এখন প্রশ্ন হলো, ইসরাইল-আমেরিকা ও ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো কেনই-বা ইরানের টার্গেটে পরিণত হলো। কারণ, আরব দেশগুলো নিজেদেরকে শত্রুর হাত বিশেষ করে ইরান থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি করার অনুমতি দিয়েছে। দশকের পর দশক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘাঁটিগুলো মধ্যপ্রচ্যে মোড়লের ভূমিকা পালন করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৪০ দিন এসব ঘাঁটি থেকে আমেরিকা ইরানে হামলা করেছে। এই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান মধ্যপ্রচ্যের সাতটি দেশের ১৯টি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করেছে। পাশাপাশি যেসব আরব দেশে ঘাঁটি আছে তাদের বিভিন্ন অবকাঠামো বিশেষ করে তৈল ও গ্যাস শোধনাগার, বিমান বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলা করেছে। আর এই হামলা থেকে মার্কিনীরা আরবদের রক্ষা করনতে পারেনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে তাহলে এই ঘাঁটি দিয়ে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হয়েছে। বরং এখন অনেক আরব দেশই ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়ানোর অপেক্ষায় আছে।
কারণ, ইরানের মিসাইল হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলো প্রায় ধবংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি আরবদের অবকাঠামোসহ তেল, গ্যাস খনি ও শোধনাগারগুলো প্রায় ধবংসের মুখে। ইসরাইল-আমেরিকা হামলার জবাবে ইরানের তীব্র মিসাইল হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা অন্তত এক ডজন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে গত ৯ এপ্রিল মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বর্তমান অবস্থা এতটাই নাজুক যে, এগুলো এখন উপকারের চেয়ে মার্কিন বাহিনীর জন্য উলটো ঝুঁকি তৈরি করছে। ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের হামলার পর ঘাঁটিগুলো এখন প্রায় ‘বসবাসের অনুপযোগী’ হয়ে পড়েছে।
ওয়াশিংটনের ‘আরব সেন্টার’-এর বার্ষিক সম্মেলনে জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মার্ক লিঞ্চ বলেন, ‘গত এক মাস ধরে ইরান মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের অবকাঠামোগুলো অকেজো করে দিয়েছে। অথচ এই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সঠিক চিত্র সামনে আসছে না।’ বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও ওমান—এই ছয়টি দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে প্রবেশাধিকার পেন্টাগন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। এমনকি গত মাসে এসব দেশের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্রের কোনো ছবি বা ভিডিও ধারণ ও প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
মার্ক লিঞ্চ আরও বলেন, ‘বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দফতরও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। ৯ হাজার সেনার আবাসস্থল এই ঘাঁটিটি এখন এতটাই অরক্ষিত যে, সেখানে নৌবহরকে আবার ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল জুড়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ১৯টি ঘাঁটি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলটি মিশর থেকে ইরাক পর্যন্ত এবং উত্তর সিরিয়া থেকে দক্ষিণ ওমান পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ঘাঁটিগুলোতে সব মিলিয়ে ৫০ হাজার পর্যন্ত সৈন্য থাকতে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান হামলার পর এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে অব্যাতভাবে মিসাইল হামলার প্রেক্ষাপটে তাদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যে সামরিক গ্যারিন্টি দেশগুলোকে দিয়েছে তাদেরও সামিরক উৎকর্ষতার বদৌলোতে সেই গ্যারান্টি এখন প্রশ্নবিদ্ধ। খোদ দেশগুলো থেকে প্রশ্ন উঠেছে এই গ্যারান্টির আসলে গ্যারান্টি কী?
অন্যদিকে, ১ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে এ অঞ্চলের বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থাটির এক নতুন মূল্যায়নে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংঘাতের ফলে আরব অঞ্চলের সম্মিলিত জিডিপির ক্ষতি হতে পারে ৩ দশমিক ৭ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ১২০ থেকে ১৯৪ বিলিয়ন বা ১২ হাজার কোটি থেকে ১৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে বেকারত্ব বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত। এতে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ চাকরি হারারে এবং নতুন করে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। বাস্তবতা হলো, এই অঞ্চলে গত বছর ৩৬ লাখ কর্মসংস্থানও হয়নি।
‘মিলিটারি এসকেলেশন ইন দ্য মিডল ইস্ট’ (মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি) শীর্ষক এই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, সংঘাতের কারণে বাণিজ্য ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ায় উৎপাদন ও বিনিয়োগে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট; সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ইরাক ও ফিলিস্তিন অঞ্চলের জিডিপি ৫ দশমিক ২ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
মধ্যপ্রচ্য মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো কোথায়
‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’র মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের অন্তত ১৯টি স্থানে স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয় ধরনের সামরিক স্থাপনার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। এর মধ্যে আটটি হলো স্থায়ী ঘাঁটি। যা বাহরাইন, মিশর, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত জুড়ে অবস্থিত।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সৈন্য সংখ্যা
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সৈন্য মোতায়েন করা হয় ১৯৫৮ সালের জুলাই মাসে, যখন লেবানন সংকটের সময় বৈরুতে যুদ্ধরত সৈন্য পাঠানো হয়েছিল। সর্বোচ্চ পর্যায়ে লেবাননে প্রায় ১৫ হাজার মেরিন ও সেনা সদস্য ছিল। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মার্কিন সৈন্য রয়েছে। এসব দেশে সবচেয়ে বেশি মার্কিন সৈন্য রয়েছে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবে। এই ঘাঁটিগুলো বিমান ও নৌ অভিযান, আঞ্চলিক রসদ সরবরাহ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং শক্তি প্রদর্শনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।
[সূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন]