কচুরিপানা: সমস্যা থেকে সম্পদ
৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৬:৫৬
কচুরিপানা ভাসমান বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। এটি আমাদের দেশীয় উদ্ভিদ নয়। উদ্ভিদটির আগমন ঘটেছে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলের আমাজনে গহীন বন থেকে। কচুরিপানা আইকর্নিয়া গণের অন্তর্ভূক্ত। বৈজ্ঞানিক নাম Eichhornia crassipes। বংশ বিস্তার ক্ষমতা অসাধারণ এবং মাত্র ০২ সপ্তাহেই এটি দ্বিগুন হতে পারে। কচুরিপানার বীজ উৎপাদনের হার অনেক বেশি এবং অনুকুল পরিবেশ না পেলে ৩০ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থেকেও এর বীজ অংকুরিত হতে পারে। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ফুলের সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে জর্জ মরগ্যান নামের এক পাট ব্যবসায়ী বাংলায় নিয়ে এসেছিলেন আমাজন এলাকার এই উদ্ভিদটি।
কচুরিপানার রয়েছে অনেক পুরনো ইতিহাস। ১৯০০ সালে নতুন শতাব্দীর শুরুতে পূর্ব বাংলার বিস্তীর্ণ জলাশয়ে কচুরিপানার ভয়াবহ বিস্তার ঘটে। ১৯১৪ সালে খাল, বিল, নদী, নালায় এর বিস্তার এতটাই ঘটেছিল যে নৌ পথে ধান, পাট ও খাদ্যসহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের পরিবহণ ও চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। পানির উপরে এর ব্যাপক উপস্থিতি পানির নিচে অক্সিজেন সংকট তৈরি করে, জলাশয়ের পানির পানযোগ্যতা কমে আসে, মাছ আর জলজ প্রাণীর পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পাশাপাশি এটি একটি জলাশয়ে অনেকগুলো ‘ওয়াটার পকেট’ তৈরি করে। সেই জায়গাগুলো থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে ব্যাপক জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বাধ্য হয়েই নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন চেম্বার অফ কমার্স কচুরিপানার বিস্তার ঠেকাতে ইংরেজ প্রশাসকদের কাছে একটি আবেদন করে। এরপর ইংরেজ প্রশাসকরা অর্থনীতি বাঁচানোর তাগিদে কচুরিপানার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গবেষকদের শরনাপন্ন হন।
শ্রী দেবেন্দ্রনাথ মিত্র প্রবাসী পত্রিকায় (১৩৬১) ‘কচুরি পানা’ শিরোনামে ৫৫ পৃষ্ঠার একটি লেখা প্রকাশ করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বাংলায় এ আগাছাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে একে ‘জার্মান পানা’ বলা হতো। এটি জার্মানদের একটি ষড়যন্ত্র হিসাবে ব্যাখ্যা করা হতো, যেখানে তারা ভারতীয় জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে ব্রিটিশদের দুর্বল প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে প্রচার করতো। ইতিহাসবিদ ইফতেখার ইকবালের একটি গবেষণার শিরোনাম হলো- ‘ফাইটিং উইথ অ্যা উইড: দ্য ওয়াটার হায়াসিন্থ, দ্য স্টেট অ্যান্ড দ্য পাবলিক স্কোয়ার’। ১৯১৪ সালে কচুরিপানার ব্যাপক বিস্তারের ফলে কৃষকদের জন্য জমিতে পাট কাটা কঠিন হয়ে পড়ে। পাটবাহী নৌকাগুলো খালপথে চলাচলে বাধার সম্মুখীন হয়। বাংলা সরকার ১৯১৮ সালে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কচুরিপানা নির্মুলের নির্দেশনা প্রদান করে। ১৯২০ সালে ঢাকার কালেক্টর, পঞ্চায়েত সভাপতিদের মাধ্যমে কচুরিপানার বিরুদ্ধে একটি অভিযান শুরু করেন এবং একটি ‘কচুরিপানা দিবস’ চালু করেন। ১৯২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় একটি পঞ্চায়েত সম্মেলন আয়োজন করে জানিয়ে দেয়া হয় কচুরিপানা নিধনের কাজে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তি দেওয়া হবে।
কচুরিপানার উৎপাত ঠেকাতে সরকার বেঙ্গল জলপথ বিধি, বেঙ্গল পৌরসভা বিধি, বেঙ্গল স্থানীয় সরকার বিধি, বেঙ্গল গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন বিধির সহায়তায় এ দুর্যোগ মোকাবিলার উদ্যোগ গ্রহণ করে, কিন্তু তেমন সুফল পাওয়া যায় নি। অবশেষে সরকার সর্বসাধারণের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কচুরিপানা উৎখাত শুরু করে।
১৯৩৬ সালে কার্যকর কচুরিপানা বিধি মোতাবেক সকলের জন্য তাদের নিজ জমি বা দখলি এলাকায় কচুরিপানা রাখা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং কচুরিপানা উৎখাত অভিযানে সকলের সহায়তা বাধ্যতামূলক করা ১৯৩৭ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে সব বড় রাজনৈতিক দল কচুরিপানা নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৩৭ সালে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন দলটি ক্ষমতায় আসার পর নির্মূল প্রচেষ্টা আরও জোরদার হয়। ১৯৩৯ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে, তৎকালীন পূর্ববঙ্গ সরকার ‘কচুরিপানা সপ্তাহ’ উদযাপনের উদ্যোগ নেয় এবং সমন্বিতভাবে কচুরিপানা নির্মূল অভিযান পরিচালনা করা হয়। ১৯৪৬ সালের একটি হিসাব অনুযায়ী দেখা যায়, কচুরিপানার কারণে বছরে মাছ এবং ফসলের উৎপাদনে ১ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
১৯৪৭ সাল নাগাদ কচুরিপানার সমস্যাটি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পরের দশকে দেশের অনেক নদীনালায় নাব্যতা আবার ফিরে আসে। এখনও দেশের অনেক জায়গায়, বিশেষত বিল ও হাওরে কচুরিপানা আছে, কিন্তু তাতে নৌ চলাচল বা চাষাবাদে কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কচুরিপানা ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অন্যান্য জলজ-সম্পর্কিত রোগের উৎস। মাছের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এটি জনসাধারণের পুষ্টিতেও প্রভাব ফেলে। ‘ন্যাচার’ পত্রিকায় কচুরিপানা নিয়ে ‘ওয়াটার হায়াসিন্থ: অ্যা কার্স অর অ্যা ক্রপ?’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় কচুরিপানা একটি বড় সমস্যা কিন্তু ক্রমান্বয়ে কচুরিপানার বহুবিধ ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এটি হয়ে ওঠছে একটি সম্পদ।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে কচুরিপানার পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মর্যাদায় এসেছে পরিবর্তন। এতদিন যাকে আগাছা ও পরিবেশসহ অন্যান্য ফসলের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল তা এখন অর্থনৈতিক সম্পদ ও পরিবেশ বন্ধুর মর্যাদা পেয়েছে। উত্তরে হিমালয় দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর আর নদী বিধৌত প্রকৃতি নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষির ওপর দাড়িয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের নিম্নাঞ্চলগুলো আরো বেশি জলাবদ্ধ হচ্ছে। দেশের কৃষি ব্যবস্থায় এসব জলমগ্ন এলাকা কোন ভূমিকা রাখতে পারছেনা। দেশের নিম্নাঞ্চলগুলোতে কচুরিপানা ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরীর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের সবজি ও অন্যান্য ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। সাধারণত বর্ষায় বন্যাকবলিত এলাকায় বীজতলা করার মতো জায়গা থাকে না। তাছাড়া বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর চারা তৈরির প্রয়োজনীয় সময় থাকে না। এক্ষেত্রে কচুরিপানার ভাসমান বেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দেশের পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলা ভাসমান বেড পদ্ধতিতে ফসল চাষের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ এলাকা। এছাড়াও বরিশাল, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ জেলাসহ আরও অনেক জেলায় এ পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে বর্তমানে ৪১ প্রজাতির শাক-সবজির চাষাবাদ করা হচ্ছে। দুইশ’ বছরেরও আগে থেকে চলে আসা এ বিরল কৃষি পদ্ধতিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতিপত্র দিয়েছে।
মাটির পুষ্টি উপাদানের কারণেই ফসল উৎপাদন হয়। আর পুষ্টি থাকে এই উপরিভাগেই, যা গঠনে হাজার বছর সময়ও লাগতে পারে। অথচ কি অবলীলায় নিমেষেই আমরা মাটির উপরিভাগ নষ্ট করছি ইটভাটার চুল্লিতে পুড়িয়ে! জাতিসংঘের হিসাব মতে, বর্তমান হারে মাটির উপরিভাগ ধ্বংস হতে থাকলে আর ৪৫ থেকে ৬০ বছর পর তা শেষ হয়ে যাবে; অর্থাৎ আমরা আর ফসল ফলাতে পারব না। আর মাটির সেই পুষ্টি যোগাতে জৈব সারের ক্ষয়পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে কচুরিপানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে তিতাস নদের পারে কচুরিপানা থেকে তৈরি হচ্ছে জৈব সার। অতি সম্প্রতি এই সার উৎপাদন করছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম। জলজ উদ্ভিদ থেকে তৈরি জৈব সারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জলকমল’।‘জৈব সার তৈরিতে মিশ্রণে অর্ধেক গোবর ও অর্ধেক কচুরিপানা ব্যবহার করা হয়। বিসিআইসির সারের ডিলারের মাধ্যমে ২৬টি দোকানে জৈব সার কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ২৫০ বস্তায় জলকমলের স্টিকার লাগিয়ে ১০ টন সার প্যাকেটে ভরা হয়েছে। প্রতি কেজি সার ১৫ টাকা। এই জৈব সার ব্যবহার করে মাছ, ধান, গম, ভুট্টা, পাট, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, বেগুন, কচু, কলা, পেঁপে, কুমড়াসহ মৌসুমি ফলদ বৃক্ষ উৎপাদন করা যাবে।
কচুরিপানা ও জলজ আগাছা দিয়ে তৈরিকৃত বেডে অনায়াসে আপদকালীন সময়ে আমনের অংকুরিত বীজ বপন করে চারা উৎপাদন করা যায়। তবে বীজ ছিটানোর আগে বেডের ওপর ২-৩ সেন্টিমিটার পরিমাণ পুকুরের তলার কিংবা মাটির পাতলা কাদার প্রলেপ দিয়ে ভেজা বীজতলা তৈরি করতে হবে। বন্যার পানিতে যেন ভাসমান বেড যেন ভেসে না যায় সেজন্য ভাসমান বীজতলার বেডকে দড়ির সাহায্যে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখতে হবে। বীজ ছিটানোর পর সতর্ক থাকতে হবে যেন পাখি বা অন্য কিছু বীজগুলো নষ্ট করতে না পারে। ভাসমান বেডে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকে বলে সমতল ভূমির তুলনায় ঘন করে বীজ বপন বা চারা রোপণ করা যায়। আবার ভাসমান বেডে বেশি জৈব সারের কারণে জমিতে প্রচলিত চাষের তুলনায় ফসল দ্রুত বাড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৩-৫ গুণ বেশি ফলন পাওয়া যায়। বন্যার শেষে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় এসব ভাসমান বেড যখন মাটির ওপর বসে যায় তখন তা ভেঙে জমিতে বিছিয়ে বা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে সফলভাবে বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করা যায়। এছাড়া, মৌসুম শেষে পচা কচুরিপানা ফল গাছের গোড়ায় সার হিসেবে ব্যবহার করে ফলের উৎপাদন বাড়ানো যায়। ফল গাছের গোড়ায় পচা কচুরিপানা ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানো যায়।
বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে Food & Agricultural Organization উদ্ধৃত করে বলে প্রতি ১০০ বর্গমিটার ভাসমান বেডে শস্য/ শাক সবজি উৎপাদনে খরচ পড়ে ৯৪ ডলার বা ৮০০০ টাকা আর এতে আয় হয় ১৫৬৮০ টাকা অর্থাৎ নেট লাভ ৭৬৮০ টাকা। ভাসমান বেডে আবাদকারি কৃষকদের মতে এটি অধিক সাশ্রয়ী ও পরিবেশ বান্ধব কারণ এটি মাটির সংস্পর্শে না থাকায় মাটি বাহিত রোগ হয় না। মাটি না থাকায় আগাছা জন্মানোরও কোন সুযোগ নাই। তাছাড়া ফসলকে গরু বা ছাগলের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অতিরিক্ত কোন বেড়া দেয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কচুরিপানা লবণ সহিষ্ণু হওয়ায় ফসলের কোন ক্ষতি হয় না। ফসল ঘরে তোলার পর যখন পানি শুকিয়ে যায় তখন বেডের কচুরিপানাও পঁচে যায় যা দিয়ে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষকেরও ফসল উৎপাদনের জন্য নতুন করে জৈব সারের প্রয়োজন হয় না। এই সার দিয়েই শালগম, বাঁধাকিপি, ফুলকপি, করল্লা প্রভৃতি শাক সবজি চাষ করে থাকে যা কৃষকের জন্য এক ঢিলে দুই শিকারের মতোই লাভজনক।
বাংলাদেশে কচুরিপানাকে ভাসমান সবজি চাষ, মাছের খাবার, জৈব সার, গবাদি পশুর খাবার, রাস্তার গর্ত ভরাট করা, পিচ ঢালাইয়ের নতুন রাস্তায় পানি দেয়ার ও পিচ মজবুত করার জন্য, সিমেন্টের খুটি মজবুত করা ও পানি ধরে রাখার জন্য ব্যবহার করে থাকে। নালা-ডোবায় জন্ম নেয়া কচুরিপানা দিয়ে তৈরি পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হয়। কচুরিপানার এ কাগজ দিয়েই ৩০টিরও বেশি পণ্য বানানো হচ্ছে। নোটবুক, ঝুড়ি, ঘর সাজানোর সামগ্রী দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাপিয়ে বিশ্বের ২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে। বিবর্তন হেন্ড মেইড পেপার প্রজেক্ট নামের একটি সংগঠন কচুরিপানা থেকে এ কাগজ তৈরি করছে। দেশব্যাপী সংগঠনটির ২৯টি ইউনিট রয়েছে। এসব ইউনিটে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৩ হাজার। প্রসঙ্গত, ৯০ দশকে গড়ে ওঠা এমসিসি নামের একটি এনজিও প্রথম কচুরিপানা দিয়ে কাগজ তৈরির কাজ শুরু করে। আর প্রতি বছর কমবেশি ২০ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়। এতে পাল্টে যাচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা।
কচুরিপানা এশিয়া মহাদেশের বেশ কিছু দেশের খাবারের মেন্যুতে স্থান পেয়েছে। এটি দিয়ে বিভিন্ন ধরণের রান্না করা হয়ে থাকে। এর থেকে তৈরি খাবার সুপার ফুড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কচুরিপানাতে থাকা বিভিন্ন পুষ্টিগুণ শারীরিক নানা সমস্যার সমাধান করতে পারে। ২১০ গ্রাম কচুরিপানায় রয়েছে ৭২২ ক্যালোরি, ৪ গ্রাম ফ্যাট, ৪৪ মিলিগ্রাম সোডিয়াম, ১২৮ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ৫০ গ্রাম প্রোটিন, ২৭% ক্যালসিয়াম ও আয়রন ৫৯%। এই উদ্ভিদটির অংশ-বিশেষ কখনো সেদ্ধ না করে কাঁচা অবস্থায় খাওয়া যাবে না, কারন তাতে পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি রান্না করে বা ভেজে নিয়ে নিশ্চিন্তে খাওয়া যায়। যারা সর্দি কাশিতে ভুগছেন তাদের জন্য কচুরিপানা থেকে তৈরি খাবার বা ঔষধ ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।
ক্যারোটিন সমৃদ্ধ খাদ্য হওয়াতে তাইওয়ানে কচুরিপানার সবুজ অংশ শাক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাপানে সবুজ কচি ডাল ও ফুল রান্নার সবজি হিসাবে ব্যবহার করছে এবং ভিয়েতনামে কচি পাতা ও ফুল সালাদ হিসেবে খাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে কিছু কিছু অঞ্চলে কচুরিপানার ফুল দিয়ে পাকোড়া বানিয়ে খাওয়া হয়। গবেষনায় কচুরিপানার পাতাতে সর্বাধিক প্রোটিন পাওয়া গিয়েছে। কচুরিপানার পাতা এ্যানালাইসিস করে দেখা গেছে যে এতে প্রোটিন ৫০%, কার্বোহাইড্রেট ৩৩% এবং বাকী ১৭% হল ফ্যাট, ছাই এবং ফাইবার। কচুরিপানার এ্যামিনো এসিড বিশ্লেষন করে দেখা গেছে যে ২০টি সাধারন এ্যামিনো এসিডের মধ্যে ১৭ টির উপস্থিতি আছে। কচুরিপানা নিয়ে যুগে যুগে বহু গবেষনা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এখনও তেমন ভাবে অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হননি, তবে গবেষনায় কচুরিপানা মানুষের খাদ্য হিসেবে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় বলে জানা গেছে। এই জলজ উদ্ভিদটি প্রাণী খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার করা হয়।
কচুরিপানাতে অনেক ঔষধি গুণাবলী রয়েছে। স্বাস্থ্য, ত্বক ও চুলের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান আছে এই কচুরিপানায়। যেমন- ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়, একজিমা সারায়, চুল পরিষ্কার, ঝলমলে ও কোমল ভাব আনে, দাঁত ও গলা ব্যথা কমাতে, কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে, মাতৃদুগ্ধ বাড়াতে, অনিয়ন্ত্রিত ঋতুস্রাবের সমস্যা সমাধানে, ওজন নিয়ন্ত্রনে, রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাহায্য করে কচুরিপানা। ত্বকের বিভিন্ন কালচে দাগ এবং রোদে পোড়া ভাবও কমিয়ে আনতে পারে কচুরিপানার নির্যাস এবং এই নির্যাস ফেসপ্যাক হিসেবে ব্যবহার করলে ত্বক কোমল ও মসৃণ হয়। অনেক প্রসাধনী তৈরিতে কচুরিপানা প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কচুরিপানা বেটে ব্যবহার করলে এক্সিমা সারাতে সাহায্য করে। এর রস চুলে ব্যবহার করলে চুল পরিষ্কার হয় এবং চুলে ঝলমলে ও কোমল ভাব চলে আসে। কচুরিপানার রস তেলের সঙ্গে মিশিয়ে চুলে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়। এর পাতা পানিতে ফুটিয়ে গার্গেল করলে পাতায় থাকা অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান দাঁতের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে এবং গলা ব্যথাতেও কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। কচুরিপানায় থাকা কিছু উপাদান রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। কেনিয়ার নারীরা মাতৃদুগ্ধ বাড়াতে কচুরিপানা ব্যবহার করে আসছে। কচুরিপানাতে থাকা অ্যামিনো এসিড রক্তক্ষরণ বন্ধের কাজ করে। এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার যা ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে। এভাবেই কচুরিপানা সমস্যা থেকে আস্তে আস্তে সম্পদে পরিণত হয়ে ওঠে।
লেখক: অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম
সারাবাংলা/এএসজি