Friday 20 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দেশে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হচ্ছে ভার্টিক্যাল ফার্মিং

এমদাদুল হক তুহিন সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ২৩:০০ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ২৩:০৯

ঢাকা: উন্নত বিশ্বের মতো দেশে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু হচ্ছে ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ের (উল্লম্ব কৃষি)। এই পদ্ধতিতে অল্প জমিতে প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে বহুগুণ ফসল ফলানো সম্ভব। কাঁচে ঘেরা ঘরের ভেতরে ধাপে ধাপে বা কলাম আকারে উল্লম্ব দিকে ফসল ফলানোর বাণিজ্যিক এই পদ্ধতিটি দেশে শুরু করতে যাচ্ছে এসিআই এগ্রিবিজনেস। এর জন্য নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে এসিআই। পদ্ধতিটির সম্ভাব্যতা যাচাইও হয়ে গেছে। শিগগিরই দেশে এই পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রদর্শনী শুরু হবে।

কৃষিবিদরা বলছেন, ক্রমাগত চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়ার এই সময়ে দেশে পদ্ধতিটির যাত্রা শুরু হওয়া খুবই ইতিবাচক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই পদ্ধতি খুবই সম্ভবনাময়।

বিজ্ঞাপন

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিনিয়তই বিশ্বে আবাদী জমি কমে কমছে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। চাষযোগ্য জমি কমে যাওয়ার কারণেই ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ের উদ্ভাবন।

দেশের কৃষিবিদরা বলছেন, প্রচলিত পদ্ধতিতেও ভার্টিক্যাল ফার্মিং সম্ভব। মূলত কেবল ভূমিকে ব্যবহার না করেও চাষাবাদের বিকল্প পদ্ধতিই ভার্টিকাল ফার্মিং। কোনো একটি ভূমি বা জমি থেকে ওপরে দিকে কলাম আকারে একাধিক ধাপ তৈরি করে তাতে ফসল ফলানোই হচ্ছে এই উল্লম্ব পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে দেশে পিরামিড আকারে কলাম তৈরি করে ধাপে ধাপে ফসল চাষ করা যেতে পারে বলে মনে করেন কৃষিবিদরা। তবে বিশ্বে অল্প জায়গায় স্বচ্ছ কাঁচে ঘেরা পুরো নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ভার্টিক্যাল ফার্মিং হয়ে থাকে।

সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল নেদারল্যান্ডস সফর করেছে। দেশটিতে ভার্টিক্যাল পদ্ধতিতে চাষাবাদ দেখে অনুপ্রাণিত হন দেশের ব্যবসায়ীরা। তারই ধারাবাহিকতায় এসিআই এগ্রিবিজনেস নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে। বাণিজ্যিকভাবে দেশে এই পদ্ধতিটি নিয়ে আসতে কাজ করছে এসিআই।

এসিআই এগ্রিবিজনেস ডিভিশনের প্রেসিডেন্ট ড. ফা হ আনসারী সারাবাংলাকে বলেন, ভার্টিক্যাল এগ্রিকালচার বা ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ের মাধ্যমে ধাপে ধাপে শেডে চাষাবাদ হবে। এই পদ্ধতিতে এক হেক্টর জমিতে ১ হাজার টন ফসল ফলানো সম্ভব, যেখানে দেশীয় পদ্ধতিতে আবাদ করলে প্রতি হেক্টরে ফলন মাত্র ২৪ থেকে ২৫ টন, যা শীতকালে ৬০ টন হতে পারে। এর জন্য শেড বা হাউজ বানাতে হবে। গ্রিনহাউজের মতো পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে। আর সেই ঘরটির ভেতেরই চাষাবাদ হবে। দেশে এখনও এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ শুরু হয়নি।

তিনি বলেন, সম্প্রতি আমরা নেদারল্যান্ডস গিয়েছিলাম। সেখানে দেখেছি, রাস্তার দুই ধারেই এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে। পরে আমরা নেদারল্যান্ডসের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছি। আমরা ফিজিবিলিটি করে দেখছি, বাংলাদেশে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব। আমরা শিগগিরই আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে একটি প্রদর্শনী (চাষ) করব। এই পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য শেড তৈরির কিছু যন্ত্রপাতি বাইরে থেকে আনব। কিছু জিনিসপত্র দেশেই পাওয়া যাবে। সিস্টেমের জন্য সফটওয়্যার বাইরে থেকে আনতে হবে। এই পদ্ধতিতে সবজি, ফুল ও কিছু ফলের চাষ করা যাবে।

ড. ফা হ আনসারী আরও বলেন, এই পদ্ধতিতে কেমিক্যাল লাগবে না, পেস্টিসাইড লাগবে না। পরিমাণমতো সার ও বীজ হলেই চলবে। চাষাবাদ করা যাবে সারাবছর। কৃষিমন্ত্রী এই পদ্ধতির প্রতি খুবই আগ্রহী। সরকার যদি কৃষক বা উদ্যোক্তাদের কিছু ভর্তুকি দেয়, তাহলে এই পদ্ধতি দেশে জনপ্রিয় হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে এসিআই এগ্রিবিজনেসের এই কর্মকর্তা জানান, এই পদ্ধতিতে আবাদের জন্য প্রতি বর্গমিটার শেড তৈরিতে সাড়ে তিন হাজার টাকার মতো খরচ হবে। ৩ হেক্টর আবাদি জমি তৈরিতে প্রয়োজন হতে পারে কোটি টাকার মতো। সাধারণ কৃষক পদ্ধতিটির প্রতি আগ্রহ না দেখালেও উদ্যোক্তারা এর প্রতি বেশ আগ্রহী হবেন।

ব্যতিক্রমধর্মী এই চাষাবাদ পদ্ধতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) হর্টিকালচার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. তামান্না হক সারাবাংলাকে বলেন, ভার্টিক্যাল ফার্মিং খুবই সম্ভাবনাময় পদ্ধতি। প্রথম দিকে হয়তো এর জন্য বেশি খরচ হবে। কিন্তু সারাবছরই এই পদ্ধতিতে কোনো না কোনো ফসল উৎপাদন করা যাবে। যেহেতু এখানে সবকিছুই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা হবে, ফলে ফলনও পাওয়া যাবে ভালো। শুরুর দিকে লাভ কম হলেও পরের দিকে এই পদ্ধতিতে লাভবান হওয়া যাবে অনেক বেশি। দেশে এই পদ্ধতির যাত্রা শুরু হওয়াটা কৃষির জন্য খুবই ইতিবাচক।

এই কৃষিবিদ বলেন, চীন ভ্রমণে দেখেছি— সেখানে ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ের জয়জয়কার। ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ে শর্ট ক্রপগুলো (অল্প সময়ে ফলন দেয় যেসব ফসল) বেশি হয়। অল্প জায়গায় অনেক বেশি চাষাবাদ করা যায়। দেশীয় প্রেক্ষাপটে এই পদ্ধতিতে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা অনেক। কৃষকের পক্ষে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা একেবারেই সম্ভব নয়— তা ঠিক নয়। প্লাস্টিকের বোতল দিয়েও এটি করা যেতে পারে। শুরুতে হয়তো কৃষক নিজেই পারবে না, কিন্তু সম্ভব। আর বড় পরিসরে করতে চাইলে প্রোটেকটিভ ওয়েতে করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রচলিত কৃষিতেও ভার্টিক্যাল ফার্মিং সম্ভব। আমরা যেমন অনেকেই ছাদ বাগান করছি। সেখানে একটি কলামে বাগান করছি। কিন্তু ভার্টিক্যাল পদ্ধতিতে একটি কলামের ওপর আরেকটি কলাম বসিয়ে সেখানে চাষাবাদ করা যাবে। কারণ সমতলে জায়গা কমে যাচ্ছে। সে কারণে চাষাবাদের ক্ষেত্রে আমরা ওপরের দিকে যাচ্ছি। ভূমির ওপরের দিকের জায়গাও কাজে লাগাচ্ছি। আর প্রচলিত পদ্ধতিতে ভার্টিক্যাল ফার্মিং করতে চাইলে পিরামিড আকারে একটির ওপর আরেকটি ধাপ বা কলাম তৈরি করতে হবে। এতে সূর্য ও আলো-বাতাস সব দিকেই পড়বে।

এক প্রশ্নের উত্তরে ড. তামান্না বলেন, প্রোটেকটিভ ওয়েতে ভার্টিক্যাল ফার্মিং করার ক্ষেত্রে একটি ঘরের ভেতের বা একটি ছাদের নিচে একাধিক কলাম তৈরি করা হয়। পুরো রুম বা ঘরটি হয় কাঁচে ঘেরা। প্রোটেকটিভ ওয়েতে চাষাবাদের জন্য মাটি বা পানিও ব্যবহার করা হয়। পানিতে শস্য উৎপাদন হতে পারে। এক্ষেত্রে সবসময় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। ফসল বা গাছে পানি দেওয়ার জন্য ওয়াটার পাম্প ব্যবহার করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

জানা গেছে, ভার্টিক্যাল ফার্মিংয়ে সূর্যের আলো ছাড়াই রুমে চাষাবাদ হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতিতে লেটুস ও পাতাকপিসহ চাষ হচ্ছে কয়েক ধরনের সবজি। গতানুগতিক পদ্ধতির চেয়ে আলাদা হওয়ায় এতে জায়গা কম লাগছে। এই পদ্ধতিতে সালোক সংশ্লেষণের জন্য ব্যবহার করা হয় বেগুনি রঙের এলইডি লাইট। একটি রুমে কয়েকটি শেড তৈরি করা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাটি থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত ১৪টি শেড তৈরি হয়ে থাকে।

ডেনমার্কের কোপেনহেগে অবস্থিত সর্ববৃহৎ ভার্টিক্যাল ফার্ম নরডিক হারভেস্ট। প্রতিষ্ঠানটির একজন ঊধ্বর্তন কর্মকর্তা একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলেছেন, তারা ভার্টিক্যাল ফার্মে সারাবছরই খাবার তৈরি করছেন। এই পদ্ধতিতে আবাদের ফলে প্রকৃতির কোনো ক্ষতিও করছেন না, কার্বন নিঃসরণও করছেন না। বায়ুকল (উইন্ডমিল) থেকে শক্তি ব্যবহার করছেন। সবকিছুই একটি ঘরের মধ্যে উৎপাদন হচ্ছে। রাসায়নিক সার ব্যবহার করে পানি ও বাতাসের কোনো ক্ষতি করছেন না তারা। এই পদ্ধতিতে লাভবান হওয়ার সম্ভবনা অনেক বেশি।

বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর ৩৭ শতাংশ স্থলভাগ ব্যবহার করা হয় কৃষিকাজের জন্য। জলবায়ুর পরিবর্তন চাষাবাদের জমির সহজলভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলছে প্রতিনিয়ত। সংস্থাটির ফুড পোগ্রামের মতে, চাষাবাদের উপযোগী স্থলভাগের এক-তৃতীয়াংশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

এসিআই নতুন প্রযুক্তি হিসেবে ভার্টিক্যাল ফার্মিং শুরু করতে গেলেও এই ধারণাটি দেশে একেবারেই নতুন নয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে এরই মধ্যে ভার্টিক্যাল ফার্মিং শুরু হয়েছে। রাজধানীর মিরপুরে ভার্টিক্যাল কৃষি ফার্ম নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর উদ্যোক্তা পারভীন আক্তার। তিনি জানান, এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করতে অনেক উপাদান দেশ থেকেই সংগ্রহ করা সম্ভব। পদ্ধতিটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলেও জানান এই উদ্যোক্তা।

সারাবাংলা/ইএইচটি/টিআর
বিজ্ঞাপন

প্রাইভেটকারে ২০ হাজার ইয়াবা, চালক আটক
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:১৩

আরো

এমদাদুল হক তুহিন - আরো পড়ুন