ঢাকা: আগামী ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের বহুল প্রত্যাশিত পহেলা বৈশাখ। পহেলা বৈশাখের এখনো চারদিন বাকি থাকলেও মাছের বাজারে শুরু হয়ে গেছে বৈশাখের আচ লাগা শুরু হয়েছে। কারণ বৈশাখের অনুষ্ঠানের বড় অংশজুড়ে আছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার পান্তা ও ইলিশ।
বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু চাহিদা বাড়লেও বাজারে সরবরাহ কম। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দামে পড়েছে প্রভাব। আকারভেদে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত। দাম বৃদ্ধিতে অনেকটাই বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। যাদের কাছে বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ, তাদের জন্য সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে ‘অতীত’ হতে বসেছে। যদিও এখন ইলিশ মাছের পরিবর্তে অন্য মাছ কিনছেন পান্তার সঙ্গে খাওয়ার জন্য।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাসাবো বাজার, শ্যামবাজার, শান্তিবাজার বিভিন্ন বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।
রাজধানীর বাজারগুলোতে আকারভেদে ১ কেজি ২০০ গ্রামের ইলিশ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩১০০ থেকে ৩৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। যা এক সপ্তাহ আগেও বিক্রি হতো ২৭০০ থেকে ২৬০০ টাকায়। ১ কেজি ওজনের ইলিশ ২৬০০ থেকে ২৭০০ টাকায়, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রামের প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২২০০ থেকে ২৩০০ টাকায়। যা সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে আড়াইশ থেকে ৪০০-৫০০ টাকা। ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা, কোথাও কোথাও ২২০০ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। আগের চেয়ে সরবরাহ কমার কারনে ক্রেতারাও ইলিশ মাছের কাছে কম ভিড়ছেন।
আসিফ আলী নামের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এ বছর ইলিশের আমদানি খুবই কম। জেলেরা জালে তেমন মাছ পাচ্ছে না। আরেকদিকে অভিযান লেগেই থাকে অঞ্চলভেদে। বিশেষ করে মিঠাপানি ও উজানের মাছ এ মুহূর্তে খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে আমদানি কম এবং বৈশাখকে ঘিরে চাহিদা বেশি থাকায় থাকায় ইলিশের দাম কেজি প্রতি ৪০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
কারওয়ান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী বলেন, জেলেরা খুবই কম মাছ পাচ্ছে জালে যে কারনে এ বছর মাছের আমদানি খুবই কম। বাজারে ইলিশের সরবরাহ বেশি থাকলে আমরাও কম দামে মাছ বিক্রি করতে পারতাম। বৈশাখকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই মাছের চাহিদা বেশি থাকে এবং দামও স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বেশি থাকে। কিন্তু এ বছর বাজারে মাছের আমদানি কম থাকায় এক সপ্তাহ আগেই ইলিশের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাসাবো কাঁচা বাজারের আবদুল মান্নান নামের এক মাছ বিক্রেতা বলেন, ‘এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইলিশের দাম কেজিতে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। পহেলা বৈশাখের দিন আগানোর সাথে সাথে এই দাম আরও বাড়বে। এ বছর মাছের আমদানি কম। জেলেরাও নদীতে আগের মতো মাছ পাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, আমরা বরিশালের বিভিন্ন স্থান থেকে মাছ নিছে আসি। এখানে আরও দুইজন ইলিশ মাছ বিক্রি করতো কিন্তু অতিরিক্ত দামের কারনে তারা এখানো মাছ নিয়ে আসেনি। হয়তো পহেলা বৈশাখের দুই তিন দিন আগে তারা মাছ নেবে। বর্তমানে ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম, আর তিন চারদিন পরে ক্রেতা ও মাছের আমদানি কিছুটা হলেও বাড়বে।
মগবাজার থেকে কারওয়ান বাজারে মাছ কিনতে আসা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছরই আমরা পহেলা বৈশাখের চার-পাঁচ দিন আগেই ইলিশ কিনে থাকি। একই ধারাবাহিকতায় এবারও আমি কারওয়ান বাজারে মাছ কিনতে এসেছি। কিন্তু একদিকে যেমন পছন্দ অনুযায়ী মাছ পাচ্ছি না, আবার দামও কেজি প্রতি ৩০০ চারশ টাকা বেশি রাখছে। সিন্ডিকেট করে বাজারে আমদানি কমিয়ে মাছের দাম বাড়িয়ে দিছে কিনা সরকারকে দেখার অনুরোধ রাখছি।’
রহিমা খাতুন নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘আমি অফিসের জন্য মাছ কিনতে এসেছি। ৮০০ গ্রাম ওজনের পাঁচ কেজি মাছ কিনেছি ২৪০০ টাকা কেজি দরে। বৈশাখকে ঘিরে প্রতিবছরই আমাকে মাছ কিনতে হয়। কিন্তু এবছর আমার কাছে মাছের দাম অনেক বেশি মনে হয়েছে। বাজারে মাছের সরবরাহও কম মনে হয়েছে আমার।’
এদিকে খুচরা ও পাইকারি বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। দোকানগুলোতে ৫ লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল মিললেও সরবরাহ কম। আধা লিটার, এক ও দুই লিটারের বোতল বেশিরভাগ দোকানেই পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কিছু দোকানে খোলা সয়াবিন তেল মিললেও তা বিক্রি হচ্ছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশিতে।
এখন সরকার নির্ধারিত এক লিটার বোতলজাত তেলের দাম ১৯৫ টাকা। অন্যদিকে, খোলা সয়াবিন তেলের দাম ১৭৬ টাকা ও পাম তেলের নির্ধারিত দাম ১৬৪ টাকা। তবে বাজারে খোলা সয়াবিন ২০০ থেকে ২১০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর পাম বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়।
খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন, ডিলাররা তেলের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছেন। এ অবস্থা মাসখানেকের বেশি সময় ধরে চললেও গত তিন-চারদিন ধরে একেবারে অর্ডার নেওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন।
ব্রয়লার মুরগির দাম স্থিতিশীল থাকলেও ঈদের পর থেকে রেকর্ড সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে সোনালি মুরগি। তবে গত সপ্তাহের চেয়ে এই সপ্তাহে দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। প্রতি কেজি সোনালি মুরগি এখন বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে। যা কদিন আগেও ৪৫০ টাকায় উঠেছিল।
এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে ২২০ টাকায় উঠে যাওয়া ব্রয়লার মুরগি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮৫ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে।
অন্যদিকে, বাজারে বেড়েছে ডিমের দাম। ফার্মের মুরগির প্রতি ডজন ডিম ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১১০ টাকার মধ্যে। পাড়া-মহল্লার কিছু কিছু খুচরা দোকানে ডিম ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা ডজনে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে বাজারে বেড়ে গেছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। বেশিরভাগ সবজিই এখন ৮০ টাকা বা তার কাছাকাছি দামে বিক্রি হচ্ছে। শুধু আলুর কেজি ২৫ আর পেঁপে-গাজর বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে।
বাজারে এখন প্রতি কেজি পটল ও ঢ্যাঁড়স ৬০ থেকে ৮০ টাকা, সিম ও সজিনা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, বরবটি, করলা ১০০ থেকে ১২০ টাকা ও কাকরোল ১২০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
তবে কম রয়েছে কাঁচামরিচ ও পেঁয়াজের দাম। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা ও পেঁয়াজ ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।