Tuesday 07 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আন্তর্জাতিক কুরিয়ারে মাদক পাচারের চেষ্টা, ডার্কওয়েব-ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কের সন্ধান

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫১

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সংবাদ সম্মেলন। 

ঢাকা: আন্তর্জাতিক কুরিয়ারার ব্যবহার করে অত্যাধুনিক মাদক কিটামিন পাচারের চেষ্টার অভিযোগে রাজধানীর উত্তরা থেকে তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর (ডিএনসি)। সেইসঙ্গে ডার্কওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সকাল ১১টা ৪০মিনিটে ডিএনসিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব জানিয়েছেন অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ।

তিনি বলেন, গত ২৫ মার্চ ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অফিসে অভিযান চালিয়ে একটি সন্দেহজনক পার্সেল আটক করা হয়। পরে পার্সেলটি তল্লাশি করে একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভিতরে বিশেষ কৌশলে লুকানো অবস্থায় ৫০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয় এবং তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকটির সত্যতা নিশ্চিত করা হয়। ওই পার্সেলের তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় অবস্থানরত একটি চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে একই দিন রাতে উত্তরায় আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিনজন চীনা নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়। তারা হলেন- লী বিন (৫৯), ইয়াং চিংসেং (৬২) এবং ইউ যেহ (৩৬)।

বিজ্ঞাপন

মো. হাসান মারুফ বলেন, অভিযানে ফ্ল্যাটটির একটি কক্ষে গড়ে তোলা অস্থায়ী ল্যাব থেকে ৬.৩০০ কেজি কিটামিন, বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য (সালফিউরিক এসিড, ইথানল, অ্যালকোহল), বিভিন্ন ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেটজাতকরণ যন্ত্রপাতি, মোবাইল ফোন এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। এসব আলামত থেকে বুঝা যায় চক্রটি সুসংগঠিতভাবে মাদক প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাচারের সাথে জড়িত ছিল।

তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করে যে, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ফ্ল্যাটের ভেতরে ল্যাব স্থাপন করে তা পাউডার আকারে প্রক্রিয়াজাত করত এবং পরবর্তীতে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করত। চক্রটি ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মাদকের অর্ডার গ্রহণ করত এবং একই মাধ্যমে বড় পরিসরে মাদক সংগ্রহ করত। তারা কিটামিন প্রক্রিয়াজাত করে সাউন্ড স্পিকারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভিতরে লুকিয়ে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে পাচার করত।

তিনি আরও বলেন, অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে চক্রটি ক্রিপ্টোকারেন্সিনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করত। তারা মূলত TRON নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লেনদেন পরিচালনা করত এবং গ্রাহকদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে মূল্য গ্রহণ করত। পরবর্তীতে তারা ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার ইউএসডিটি সমপরিমাণ অর্থ একত্রে উত্তোলন করত, যা তাদের কার্যক্রমকে গোপন রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল।

তিনি বলেন, গ্রেফতার আসামিদের ভ্রমণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তারা বিভিন্ন দেশে স্বল্প সময়ের জন্য অবস্থান করত এবং ঘন ঘন দেশ পরিবর্তন করত। এই তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, চক্রটির কার্যক্রম একাধিক দেশে বিস্তৃত থাকতে পারে এবং বিভিন্ন দেশে তাদের পৃথক প্রক্রিয়াজাতকরণ ল্যাব স্থাপিত থাকতে পারে। বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব সহকারে তদন্তাধীন রয়েছে।

মহাপরিচালক বলেন, তদন্তে আরও জানা যায়, আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার, নিয়মিত ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলা, মোবাইল ফোন ও সিম পরিবর্তন এবং ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহারসহ বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম গোপন রাখত। ফলে গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম জটিল হয়ে ওঠে।

মানবদেহে কিটামিনের ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়ে তিনি বলেন, কিটামিন একটি শক্তিশালী ডিসোসিয়েটিভ ড্রাগ, যা স্বল্পমেয়াদে বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন ও শারীরিক নিয়ন্ত্রণহীনতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি কিডনি ও মূত্রথলির মারাত্মক ক্ষতি, মানসিক সমস্যা এবং আসক্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নিয়মিত সেবনে সহনশীলতা তৈরি হয়ে ডোজ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা দেয়, যা প্রাণঘাতী ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এই আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্তে তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সমন্বয় করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর