ঢাকা: সব কিছুই পরিবর্তন হয়। কিন্তু পরিবর্তন আসে না শুধু পুঁজিবাজারে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে কথাটা যেন আরও সত্যি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের অনেক কিছুই পাল্টে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের খেলোয়াড় বা এক কথায় যাদে আমরা গ্যামলার বলে অভিহিত করে থাকি তারা বদলায়নি। সাময়িক বিরতির পর তারা ফের সক্রিয় হয়েছেন নিজেদের হাতের দূর্বল কোম্পানি নিয়ে। প্লেসমেন্ট কারসাজির দুর্বল কোম্পানিই যেন তাদের মূল উপকরণ বা আইটেম। এবারের আকর্ষণীয় সেই কোম্পানির নাম প্রকৌশল খাতের ‘ডমিনেজ স্টিল’। আওয়ামী জমানায় তালিকাভুক্তির সময় প্লেসমেন্ট কারসাজির অন্যতম নাম এই কোম্পানিটি। পুঁজিবাজারে দুঃসময়েও বিনিয়োগকারীদের হিট আইটেমে পরিণত হয়েছে এই কোম্পানিটি। কোম্পানিটির দরবৃদ্ধির নেপথ্যে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য না প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সবর্ত্র।
গত এক বছরের ঢাকা স্টক একচেঞ্জের কোম্পানিটির লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা যায়, যেখানে বিনিয়োগকারীদের রক্তক্ষরণ ঘটে নিঃস্ব হয়ে গেছে, সেখানে ঠিক উল্টো পথে হাটছে কোম্পানিটি। কী আছে কোম্পানিতে? প্রকৃতপক্ষে কোম্পানিটির আংশিকভাবে বন্ধ আছে বেশ কিছুদিন ধরেই। কোম্পানিটির বিষয়ে ঢাকা স্টক একচেঞ্জ (ডিএসই) মোট ৯৫ বার সতর্ক বার্তা দিলেও থেমে নেই দরবৃদ্ধি। যা পুঁজিবাজারের জন্য মোটেও শুভ কোন লক্ষণ নয় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্রোকারেজ হাউসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, গত এক বছরে পুঁজিবাজারে অধিকাংশ কোম্পানির দর আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ভাল-মন্দ সব কোম্পানির দর হারিয়েছে। এমন কী কোন কোন কোম্পানির দর ১ টাকার নীচে নেমে গেছে। কিন্তু ‘ডমিনেজ স্টিল’ নামের কোম্পানির কি আছে যে সারাবছর ধরে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের তালিকায় ছিল। লেনদেনের সঙ্গে কোম্পানিটির দরও বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে।
তিনি আরও বলেন, এই কোম্পানির বেশিরভাগ প্লেসমেন্ট শেয়ার এনবিআর-এর সাবেক আলোচিত কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও তার সঙ্গীদের হাতে রয়েছে। মূলত তাদের প্লেসমেন্ট শেয়ার উচ্চদরে বিক্রির জন্যই এভাবে টানা দর বাড়ানো হচ্ছে। আর এই কোম্পানির লেনদেনের সঙ্গে পুঁজিবাজারে আলোচিত ব্যবসায়ী ও সরকারী কর্মকর্তা যার বিরুদ্ধে শেয়ার কারসাজির অভিযোগে কয়েকশ কোটি টাকা ইতোমধ্যে জরিমানা করা হয়েছে, তিনি সরাসরি জড়িত রয়েছেন শুরু থেকেই। এই শেয়ার ব্যবসায়ী অনেক আগে থেকেই এই গ্রুপের অন্যান্য শেয়ার নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে অব্যাহতভাবে লেনদেন করছেন। সেই সরকারি কর্মকর্তাই ফের নিজেদের হাতের শেয়ার নিয়ে নতুন কারসাজি করে যাচ্ছেন।
শঙ্কা কোথায়
২০২০ সালে উভয় স্টক একচেঞ্জে ডমিনেজ স্টিল নামের কোম্পানিটি তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্তির পরে কোম্পানিটি মাত্র ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করে। এরপর ২০২১ সালে ৫ শতাংশ, পরে ২০২২ সালে ফের ২ শতাংশ, ২০২৩ সালে মাত্র দশমিক ৫০ শতাংশ, ২০২৪ সালে দশমিক ২৫ শতাংশ ও সবশেষে ২০২৫ সালে দশমিক ৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করেছে। এই কোম্পানিপি কখনই ১০ শতাংশ লভ্যাংশ প্রদান করতে পারেনি। অর্থাৎ ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উঠতে পারেনি। তবুও শুধুমাত্র প্লেসমেন্ট কারসাজির উদ্দেশে কোম্পানিটি নিয়মিত লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসছে।
কেমন আগ্রহ কোম্পানিকে ঘিরে
২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দর ছিল ১০.৩০ টাকা। ২০২৫ সালের ১২ জুন কোম্পানিটির দর নেমে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৯ টাকায়। এই দুই মাস কোম্পানিটির দর ১১ টাকা থেকে ১০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করতে থাকে। মূলত এই সময়টাতেই কোম্পানিটির শেয়ারের বড় অংকের হাতবদল ঘটে। জুলাই মাসের শুরু থেকে কোম্পানিটির দর কিছুটা হাওয়া লাগতে থাকে। কিন্তু কোম্পানিটির মৌলভিত্তির কোন পরিবর্তন হয়নি। এরপর থেকে পুঁজিবাজারে অনেক কিছু ঘটলেও ডমিনেজ স্টিল নামের কোম্পানিটির বিনিয়োগকারীদের ভাগ্য বদল ঘটে। এখন কোম্পানিটির ১০ লাখ টাকার শেয়ারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখ টাকায়। অর্থাৎ রাতারাতি কোম্পানিটি আলাউদ্দিনের চেরাগে পরিণত হয়েছে বিনিয়োগকারীদের কাছে। এখনও সেই চেরাগের পেছনেই ছুটছে সবাই।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, অদম্য গতিতে থেমে চললেও ডমিনেজ স্টিলের দৌঁড় থামানোর জন্য চেষ্টা করা হয়েছে খুবই কম। প্রাথমিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ডমিনেজ স্টিল নিয়ে ছিল উদাসীন। যেন পরিস্থিতি দেখেও না দেখার ভান করা হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডিএসই জানায়, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ার দর ১২.৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮.৬০ টাকায় পৌঁছায়, যাকে ডিএসই ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিনিয়োগকারীদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেয়। তখন ডিএসইর ব্যাখ্যা তলবের জবাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ বারবার জানিয়েছে যে, শেয়ারের দর বৃদ্ধির পেছনে কোনো প্রকার অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ডিএসই’র একটি পরিদর্শক দল সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে ডমিনেজ স্টিলের নরসিংদীর কারখানাটি বন্ধ পায়। যদিও ঢাকার আশুলিয়ার কারখানাটি সচল ছিল, কিন্তু একটি ইউনিটের উৎপাদন বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শেয়ার দর বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে বাজারে সংশয় তৈরি হয়েছে। এরপর থেকে ডিএসই কর্তৃপক্ষ ৯৫ বার কোম্পানিটির সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেছে।
সর্বশেষ সোমবার (০৬ এপ্রিল) ডিএসই সতর্ক করে কোম্পানিটির সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। কোম্পানি কর্তৃপক্ষও নিজস্বভাবে ডিএসই’র ওয়েবসাইটে দুইবার কোম্পানির পরিস্থিতি তুলে ধরে।
দুর্বল লভ্যাংশ ও আয়: ২০২৫ অর্থবছরের জন্য কোম্পানিটি মাত্র ০.৩৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এছাড়া শেয়ার প্রতি আয় (EPS) মাত্র ৫ পয়সা হওয়া সত্ত্বেও শেয়ার দর বৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসাকে বিশ্লেষকরা যুক্তিসঙ্গত মনে করছেন না।
সোমবার (০৬ এপ্রিল) কোম্পানিটির দর আগের দিনের চেয়ে ২ দশমিক ৩০ টাকা বেড়েছে। দিনটিতে কোম্পানিটির মোট ১৫ কোটি ৮১ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। এই দিনে কোম্পানিটির সর্বোচ্চ লেনদেন হয়েছে। টানা কয়েকদিন কোম্পানিটি লেনদেনের সেরা ২০ কোম্পানির তালিকায় স্থান পেয়েছে।
এর আগে গত কয়েক মাস ধরেই কোম্পানিটির চাহিদা বাড়তে থাকে। ওঠানামার পর কোম্পানিটির দর কেড়েছে প্রায় ৩৮ টাকার বেশি। সে হিসাবে কোম্পানিটির দর বেড়েছে প্রায় ৪শ শতাংশ। যেখানে অন্যান্য কোম্পানির দর কমেছে সেখানে আংশিক উৎপাদনে থাকা কোম্পানিটির দর বাড়াতে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। মৌলভিত্তি দুর্বল হওয়া এবং কারখানা আংশিক বন্ধ থাকা সত্ত্বেও দর বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজার বিশ্লেষকরা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এ ধরনের শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।