ঢাকা: বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার নামকরণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও বিভাজনের অবসান ঘটাতে বড় ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে প্রতিবছর পহেলা বৈশাখে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তার নাম পরিবর্তন করে এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ রাখা হয়েছে।
রোববার (৫ এপ্রিল) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী শোভাযাত্রার নামকরণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৮৯ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমলে এই আয়োজন ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এর নাম পরিবর্তন করে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ রাখা হয়। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইউনেসকো স্বীকৃত এই আয়োজনটির নাম পুনরায় পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করেছিল।
এই নাম পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এমনকি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন থেকেও এই নামকরণের বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল। মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এই বিতর্ক ও অনর্থক সংঘাতের অবসান ঘটাতে চাই।’
সংবাদ সম্মেলনে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি বলেন যে, সরকার সমাজে কোনো ধরনের বিভাজন বা অনৈক্য চায় না। তিনি আরও বলেন, নাম নিয়ে একটি বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আমরা এই বিতর্কের অবসান করতে চাই। আজকের বৈঠকে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি— আমরা এটিকে ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ও বলবো না, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ও বলবো না। শোভাযাত্রা হবে যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে, যেখানে সব সংস্কৃতির প্রদর্শন থাকবে। যার যার মতো ঢোল-বাদ্য, পোশাক-আশাক নিয়ে একটি আনন্দঘন শোভাযাত্রা হবে। এই শোভাযাত্রার নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। বৈশাখী মেলা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, বৈশাখী আনন্দ সবকিছুতেই আমরা বৈশাখকে হাইলাইট করতে চাই। এটি আমাদের সিদ্ধান্ত।
তিনি আরও বলেছেন, এ সরকারের দায়বদ্ধতা জনগণ, জাতি ও দেশের কাছে। আমরা চাই, অতীতের যা কিছু গ্লানি, তা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। কিন্তু আমরা সমাজে বিভাজন চাই না। মানুষের মধ্যে অনৈক্য ও সংঘাত আমরা চাই না। আমরা বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য চাই। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে বিভিন্ন মত, আদর্শ ও ভাবনার মানুষ থাকবে, এটিই গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য।
নাম পরিবর্তনের ফলে ইউনেসকোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃতির ওপর কোনো প্রভাব পড়বে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা কি ইউনেসকো দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র? যখন নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেসকো ছিল; যখন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল, তখনও ইউনেসকো ছিল। আমরা তাদের জানিয়ে দেব, আমাদের দেশে এখন থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ হবে। এটাই আমাদের ঐতিহ্য।’
তিনি আরও বলেছেন, শোভাযাত্রার নামে ইউনেসকো কোনো স্বীকৃতি দেয়নি। তারা স্বীকৃতি দিয়েছে বৈশাখের উৎসবকে। এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছে। আমাদের সংস্কৃতি কি শুধু শোভাযাত্রা? আরও অনেক কিছু রয়েছে।
সবশেষে মন্ত্রী জানান, আসন্ন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য ফুটিয়ে তুলতে দেশের সকল জাতিগোষ্ঠীর (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারোসহ অন্যান্য) সংস্কৃতিকে এই শোভাযাত্রায় গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো একটি সর্বজনীন উৎসব নিশ্চিত করা যেখানে নামকরণের বিতর্ক ছাপিয়ে সংস্কৃতির মূল চেতনা প্রধান হয়ে উঠবে।