Saturday 21 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চর্চার অভাবে অস্তিত্ব সংকটে গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষা

তাসলিমুল হাসান সিয়াম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৬ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:২৬

গাইবান্ধার পৌর শহীদ মিনার।

গাইবান্ধা: ‘যেদিন মুই তোমাক পতথম দেখচোম, সেইদিন থাইকেই মুই তোমাক ভালোবাসি ফেলাচোম। তুমি যকোন আসতা দিয়ে হাটি যান, মুই তোমাক গাছের আউট্যাল থ্যাকি চুরি করি দেকোম। একদিন দেকোম তুমি নাই।’

গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষার এই সরল, আবেগময় প্রকাশ আজ আর সেভাবে শোনা যায় না। আধুনিক উচ্চারণ, শহরমুখী প্রভাব ও ডিজিটাল যোগাযোগের দৌড়ে রংপুরি উপভাষার এই স্বকীয় শব্দ আর বাক্যগঠন দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে।

আবুল কাশেম সম্পাদিত ‘বাংলা আঞ্চলিক ভাষার ইতিহাস গ্রন্থ’ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষা মূলত রংপুরি বা কামতাপুরী ভাষার উপভাষা, যা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের পূর্বাঞ্চলীয় ইন্দো-আর্য শাখা থেকে বিকশিত। ইতিহাস, ভৌগোলিক অবস্থান ও সামাজিক সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে ওঠা এই ভাষা একসময় ছিল গাইবান্ধার মানুষের পরিচয়ের মূল ভিত্তি। কিন্তু দ্রুতগতির আধুনিকতা, যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসার এবং প্রমিত বাংলা ব্যবহারের চাপের কারণে এই ভাষা আজ অস্তিত্ব সংকটে।

বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধার এই উপভাষার সঙ্গে রংপুর অঞ্চলের ভাষার ঘনিষ্ঠ মিল থাকলেও পার্শ্ববর্তী বগুড়া ও যমুনা-তীরবর্তী চরাঞ্চলের প্রভাবের কারণে এতে তৈরি হয়েছে নিজস্ব ভিন্নতা। এই ভাষায় প্রচুর শ্রুতিকটু হলেও অর্থপূর্ণ শব্দের ব্যবহার প্রচলিত, যা লোকমুখে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে এবং স্থানীয় সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।

গাইবান্ধার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বই থেকে জানা যায়, প্রাচীনকালে গাইবান্ধা ছিল ঘোড়াঘাট প্রশাসনিক কেন্দ্রের অধীনে। পরবর্তীতে বৃহত্তর রংপুর জেলার অংশ হিসেবে দীর্ঘ প্রশাসনিক ইতিহাস এই অঞ্চলের ভাষাগত বৈশিষ্ট্যকে আরও গভীর করেছে। সময়ের পরিক্রমায় এই ভাষা শুধু রংপুরি উপভাষার অনুসারী হিসেবে নয়, বরং নিজস্ব স্বতন্ত্র রূপে দাঁড়িয়ে গেছে।

২০২৪ সালে গাইবান্ধায় আঞ্চলিক ভাষায় অনুষ্ঠিত পালা নাট্য উৎসব।

গাইবান্ধার নামের উৎপত্তিও এই ভাষা ও সমাজসংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত। ‘গাইবাঁধা’ অর্থাৎ গাভী বা গরু বেঁধে রাখার স্থান থেকে গঠিত এ নাম স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার পরিচয় বহন করে। নদীনির্ভর যাতায়াত ব্যবস্থা, কৃষিনির্ভর জীবনধারা এবং গ্রামমুখী সামাজিক কাঠামো এই ভাষাকে দীর্ঘদিন ধরে জীবন্ত রেখেছে।

তবে বর্তমানে স্কুল-কলেজে প্রমিত বাংলা ব্যবহারের জোর, গণমাধ্যমে প্রমিত বাংলা ভাষার প্রাধান্য এবং শহরমুখী জীবনযাত্রার প্রভাবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আঞ্চলিক ভাষার চর্চা কমে গেছে। পরিবার ও সমাজেও অনেক ক্ষেত্রে ভাষাটির ব্যবহার সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করছেন, এ ভাষা সংরক্ষণে স্থানীয়ভাবে গবেষণা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কনটেন্ট উৎপাদনের মাধ্যমে উদ্যোগ জোরদার করা জরুরি। নতুবা প্রাচীন প্রশাসনিক ইতিহাস ও নদীনির্ভর জীবনের সঙ্গে বেড়ে ওঠা গাইবান্ধার এই স্বতন্ত্র উপভাষা অচিরেই হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে এর কিছু ব্যাতিক্রম চর্চা লক্ষ্য করা যাচ্ছে স্থানীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে। বর্তমান গাইবান্ধা জেলার বেশ কয়েকজন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষায় গীত পরিবেশন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে । এদের মধ্যে অন্যতম মঞ্জু মিয়া। ২৬ বছর বয়সী এই যুবক নিজেকে নাট্যকর্মী পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘ছোট বেলায় আমি বিয়ে বাড়িতে বিভিন্ন গান শুনতে পেতাম এগুলো আমাদের স্থানীয় ভাষায় গীত বলে। প্রথমে এলাকার বিভিন্ন নাট্যপালায় আমি গীত পরিবেশন করতাম। অনেকেই আমার গলায় আঞ্চলিক গান শুনে প্রশংসা করত। এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে ফেসবুকে আঞ্চলিক গানের ভিডিও প্রকাশ করি এবং প্রতিটি গান দর্শক শ্রোতা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে।’

কবি হাফিজুল হেলালি বাবু বলেন, ‘আঞ্চলিক ভাষা হলো স্থানীয় লোকজনের সহজবোধ্য ভাষা। এই ভাষায় অপর আরেক জনের সঙ্গে কথা বললে তৃপ্তি অনুভব হয়। আমার মা এই ভাষায় কথা বলতেন তাই বলতে পারেন এটি আমাদের প্রজন্মের মাতৃভাষা। আফসোসের বিষয় তরুণরা এই ভাষায় কথা বলতে চায় না তারা ভাবছে আঞ্চলিকতা মানে অশিক্ষিত লোকের ভাষা।’

গাইবান্ধা থেকে প্রকাশিত কমিউনিটি নিউজ পোর্টাল কালের চিঠি’র প্রকাশক কবি ও সাহিত্যিক বিমল সরকার জানান, স্থানীয় সংস্কৃতিচর্চা এবং গবেষণামূলক কাজ কমে যাওয়ায় আঞ্চলিক ভাষাটি আরও অবহেলার শিকার হচ্ছে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকায় ভাষাটি সংরক্ষণের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। এর ফলে দৈনন্দিন ব্যবহারের পাশাপাশি ভাষাটির শব্দভাণ্ডার, উচ্চারণধারা ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গাইবান্ধা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বাবুল আকতার জানান, স্থানীয় ভাষা রক্ষা করতে হলে পরিবার থেকেই এর ব্যবহার উৎসাহিত করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকে আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নাটক, গান, গল্প, ভিডিও কনটেন্টে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি করলে ভাষাটি নতুন প্রজন্মের কাছে পুনরায় গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

অধ্যাপকের মতে একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু শব্দের বিলুপ্তি নয়, এটি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের পরিচয় হারানোর সামিল। তাই গাইবান্ধার আঞ্চলিক ভাষা টিকে রাখতে এখনই সচেতনতা ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। না হলে প্রজন্মান্তরে ভাষাটি হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সারাবাংলা/এনজে
বিজ্ঞাপন

বায়ুদূষণে আবারও শীর্ষে ঢাকা
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৫৫

রাজধানীতে সামান্য বেড়েছে তাপমাত্রা
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৫০

ভাষা শহিদদের প্রতি ইউজিসি'র শ্রদ্ধা
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৫

আরো

সম্পর্কিত খবর