ঢাকা: পবিত্র রমজান মাস শুরু হতে না হতেই রাজধানীর বাজারগুলোতে বইছে অস্থিরতার হাওয়া। সংযমের মাস হলেও বাজার চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে ইফতারের অপরিহার্য অনুষঙ্গ লেবু এবং সেহরি-ইফতারে প্রোটিন চাহিদা মেটানোর মাছ ও মাংসের দাম সাধারণ ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
রমজানে ইফতারের শরবতে লেবুর চাহিদা থাকে আকাশচুম্বী। আর এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ীরা লেবুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন কয়েকগুণ। এক সপ্তাহ আগে যে লেবুর হালি ছিল ২০ থেকে ৩০ টাকা, তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। তবে বড় সাইজের ভালো মানের লেবুর হালি কোথাও কোথাও ছাড়িয়েছে ১০০ টাকা। অর্থাৎ, একটি ডিমের দাম যেখানে ১০ থেকে ১৩ টাকা, সেখানে একটি লেবু কিনতে গুনতে হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মালিবাগ, কচুক্ষেত, মিরপুর, মহাখালী ও মোহাম্মদপুরের বাজারগুলোতে এমন চিত্র দেখা গেছে।
এদিকে, মাছ ও মাংসের বাজারেও স্বস্তি নেই। দাম বাড়ায় মাছ ও মাংসের বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। গরুর মাংসের দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৭০ টাকা বেড়ে বর্তমানে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্রয়লার মুরগির দামও থমকে নেই, প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়, যা গত সপ্তাহের চেয়ে ২০-৪০ টাকা বেশি। আর প্রতি কেজি সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, মাছেও যেন হাত দেওয়া মানা। বড় সাইজের চিংড়ি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১২০০ টাকায়, শৌল মাছ প্রতি কেজি ৮০০ টাকা, ভেইদা মাছ ৮০০ টাকা, রুই মাছ ৩২০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি। এছাড়া, চাষের তেলাপিয়া, পাঙাশ, পাবদা, কই, শিং, কাতলের দাম আগের চেয়ে কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। তবে সাধ্যের মধ্যে আছে ডিমের দাম, এক ডজন ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা।
ইফতারে চাপ থাকে শসা, টমেটো, গাজর ও বেগুনে। তাই বাজারে বেগুন ও শসার দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে।
মানভেদে প্রতি কেজি বেগুন ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বড় আকারের বেগুনের দাম আরও বেশি। আর প্রতি কেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এ ছাড়া, টমেটো ও গাজরের দামও কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। বাজারে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচের মতো নিত্যপণ্যের দামও বেড়েছে। পেঁয়াজের কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং কাঁচা মরিচের দাম কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রোজা উপলক্ষ্যে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ধরনের ফলের দামও বেড়েছে। এক কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকায়। আর আপেল বিক্রি হচ্ছে ৩৩০ থেকে ৪০০ টাকায়। দুই সপ্তাহ আগে মাল্টা ও আপেলের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ৮০ টাকা কম ছিল। দেশীয় ফলের মধ্যে প্রকারভেদে কলার দাম ডজনে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়েছে। এ ছাড়া পেঁপে, পেয়ারা, বরই প্রভৃতি ফল আগের তুলনায় কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
মহাখালী কাঁচাবাজারে আসা গৃহিণী পারুল আক্তার আক্ষেপ করে সারাবাংলাকে বলেন, রোজার কথা শুনলেই ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দেয়। একটা লেবু দিয়ে শরবত খাব, তারও উপায় নেই। মাছ-মাংস কেনা তো এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিরপুরে বাজারে আসা এক বেসরকারি চাকুরিজীবী আমিনুল ক্ষোভ প্রকাশ করে সারাবাংলাকে বলেন, রোজায় সংযমের কথা বলা হলেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তার প্রতিফলন নেই। একটা লেবুর দাম যদি ২০ টাকা হয়, তবে সাধারণ মানুষ ইফতার করবে কী দিয়ে? আর মাছের গায়ে যেন আগুন, ছোঁয়া যায় না।
বিক্রেতাদের দাবি, রোজার শুরুর দিকে বেশ কিছু পণ্যের চাহিদা বাড়ে। কিন্তু চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। এছাড়া, পরিবহণ খরচ বেশি হওয়ায় দাম বেড়েছে। তবে সপ্তাহখানেক পর অধিকাংশ পণ্যের দাম কমে আসতে পারে।
এছাড়া, মুরগির বাচ্চার দাম বেড়েছে। আর শীতে খামারে মুরগির মৃত্যুর কারণেও দামে প্রভাব পড়েছে বলে জানান তারা। আর প্রতিবছর রোজার শুরুতে ব্রয়লার মুরগির চাহিদা বাড়ার সুযোগটি কাজে লাগায় ব্যবসায়ীরা।
এদিকে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালানো হলেও তার প্রভাব খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না বলে অভিযোগ ক্রেতাদের। শক্তিশালী সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং না করলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।