ঢাকা: আমরা (দেশ) খুব একটা খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক, একটিভিস্ট ও বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি’র শিক্ষক ডা. জাহেদ উর রহমান।
সোমবার (২২ ডিসেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে বেসরকারি গবেষণা ও অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘ভয়েস’ আয়োজিত ‘বাংলাদেশে ডিজিটাল ও জনপরিসর: বিদ্যমান সমস্যা এবং আমাদের করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, শেখ হাসিনার সময় অনেকের মনেই ছিল যে, তাকে সরিয়ে আমি আমারটা জাহির করব। এ সরকারের প্রতি আমরা বেশিকিছু আশা করিনি। তবে ন্যূনতম যতটুকু ছিল- সেটাও করা হয়নি। তবে আমি ৫ আগস্টের সময় ফিরে গেলে সরকার হিসেবে আমি ড. ইউনূস-কেই চাইব। কারণ, তিনি ছাড়া এটা মোকাবিলা করা অসম্ভব। আমরা কোনোদিন গণতান্ত্রিক ছিলাম না। শেখ হাসিনা তার সময়ে দেশ ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। আমরা সম্ভবত খুব একটা খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি। শেখ হাসিনার সামনে নারীরা দাঁড়িয়ে গেছে, সাইবার বুলিংয়ের সামনেও তারা দাঁড়াতে পারবে। যারা গালি দিচ্ছে, তারা এক সময় ক্লান্ত হয়ে যাবে। তারপর নারীদেরই সুযোগ। একজন আমাকে বলল অমুক নারীকে এত বকাঝকা দেওয়া হচ্ছে তারপরও তাকে থামানাও যাচ্ছে না। এভাবেই আসলে এগিয়ে যেতে হবে।
সভায় ভয়েস-এর ডেপুটি ডিরেক্টর (প্রোগ্রামস) মুশাররাত মাহেরা ডিজিটাল ও জনঅধিকার বোঝার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘ডিজিটাল ও জনপরিসর আইন, নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক চর্চার মাধ্যমে গঠিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা বা জেন্ডার অপতথ্য-এর প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা বিভাজন, বিশৃঙ্খলা ও ঘৃণা ছড়িয়ে সমাজের শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট করছে। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা জোরদারের আহ্বান জানান।’
ভয়েস-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ ডিজিটাল স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের অধিকার এবং সম্মুখসারির অধিকাররক্ষকদের নিরাপত্তা রক্ষায় সংগঠনটির দীর্ঘদিনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘ডিজিটাল দমন ও অপতথ্য যখন তীব্র হচ্ছে, তখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের অধিকার রক্ষায় আমাদের একসঙ্গে দাঁড়ানো অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই পরামর্শ সভা ডিজিটাল পরিসরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সম্মিলিত দৃঢ়তার প্রতিফলন।’
গণসংহতি আন্দোলনের নির্বাহী সমন্বয়ক আবুল হাসান রুবেল বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতা এমন এক অবস্থা তৈরি করেছে যেখানে নারী নির্যাতন উদযাপন করা হয়। যেখানে অন্তর্ভুক্তির কথা বলে বৈষম্যের নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে।
মিডিয়া ব্যক্তিত্ব দীপ্তি চৌধুরী বলেন, ‘বাক-স্বাধীনতা মানে অপরের অধিকারকে সমুন্নত রেখে নিজের চিন্তাধারা এবং বিশ্বাস তুলে ধরা। তবে যদি কখনো কারো অধিকার লঙ্ঘিত হয় সেটা বিচার করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।’
মানবাধিকারকর্মী ও বিশ্লেষক মঞ্জুর রশীদ বলেন, ‘রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রয়েছে। স্ব-স্ব অবস্থান থেকে যদি জোরালো আওয়াজ তোলা হয়, তাহলে পরিবর্তন আসবেই। সবাই একত্রিত হয়ে এগিয়ে আসলেই শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।’
ডিজিটাল অপতথ্য বিশেষজ্ঞ তামারা ইয়াসমিন তমা বলেন, ‘বর্তমানে শুধু নারীদের নয়, পুরুষদের নিয়েও খুব দ্রুত অপতথ্য ছড়ানো হয়। তবে পুরুষদের তুলনায় নারীদেরকে ট্যাগ লাগালে অপতথ্য ছড়ায় দ্রুত। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে হবে। তদন্ত করে দুস্কৃতিকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবেই আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।’
সভায় মানবাধিকারকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী, নারী ও যুব প্রতিনিধি, আইনজীবী এবং শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অংশগ্রহণকারীরা একত্রিত হন, যা বাংলাদেশে ডিজিটাল ও জনপরিসর জোরদারে সম্মিলিত উদ্যোগ শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সভায় অংশগ্রহণকারীরা তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা ডিজিটাল ও জনপরিসরের বিদ্যমান সমস্যাসমূহ নিয়ে আলোচনা করেন। এতে লিঙ্গভিত্তিক অপতথ্য, দমন-পীড়ন, ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থান, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দমন, সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা এবং করণীয় বিষয়ে বাস্তবসম্মত সুপারিশ উঠে আসে। সুপারিশগুলো হলো- মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের জন্য স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা; অস্পষ্ট ও দমনমূলক আইন বাতিল বা সংশোধন; স্বাধীন নাগরিক ও মিডিয়া কমিশন গঠন; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি ও জেন্ডার সংবেদনশীল প্রশিক্ষণ; জেন্ডারভিত্তিক অপতথ্য মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি; নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা প্রদান; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্বচ্ছতা ও ভুক্তভোগী-কেন্দ্রিক প্রতিকার ব্যবস্থা; নির্বাচনপূর্ব সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতাবিরোধী অঙ্গীকার।