ঢাকা: জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের প্রধান উপদেষ্টা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমার একজন শ্রমিক ভাইয়ের ছেলে কি প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে? নাই। আমরা চাই শ্রমিক ভাই বন্ধুটির ঘর থেকে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী বের হয়ে আসুক। সেই শিক্ষা, সেই পরিবেশ সরকারকে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ‘ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ফ্যাসিজমের যাতাকলেপিষ্ট বাংলাদেশ চব্বিশের বৈপ্লবিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তি পেয়েছে। এই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছেন জীবন দেওয়া লোকদের শতকরা ৬২ ভাগ হচ্ছেন শ্রমিক। আর আমরা বাকি সবাই মিলে ৩৮ ভাগ। এটি পৃথিবীর ইতিহাস।
ইসলামের ইতিহাসেও শ্রমিকদের ভূমিকা ও অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মক্কার জীবনে ওই বঞ্চিত শ্রমিকরাই প্রথমে নবী করীম (সা.) দক্ষিণ হস্ত হিসেবে বুক টান করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোনো নির্যাতন তাদেরকে ঈমান থেকে খারিজ করতে পারেনি। তারা ঈমানের পথে অটল ছিলেন অবিচল ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও একই ঘটনা। ৯০-এর গণআন্দোলনেও একই ঘটনা, চব্বিশের গণআন্দোলনেও একই ঘটনা। অথচ রাষ্ট্রের কাছে শ্রমিক সমাজের প্রত্যাশা, দাবি ও চাহিদা খুবই মামুলি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই সামান্যটুকু চাহিদাও তাদের এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো সরকারই পরিপূরণ করতে পারেনি।
তিনি বলেন, যারা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যান তারা ওই শ্রমিকদের অঙ্গ থেকে উঠে আসেননি। তারা সোনার চামচ রুপার কাঠি হাতে নিয়ে জন্ম নিয়েছেন। তারা শ্রমিকদের দুঃখ বুঝবে কীভাবে? তাদের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী মালিক। ব্যবসায়ী মালিক হওয়া কোনো অপরাধ নয়। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খোলা হবে, মিল, ফ্যাক্টরি, ইন্ডাস্ট্রি চালু হবে। জনগণ সেখানে কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে। কিন্তু তারা ওই জনগণকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানবিক মর্যাদাটুকু দিতে ব্যর্থ। তাদের এই নোংরা আচরণের কারণেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেও যখন যান তখন একই কাণ্ডকারখানা তারা করে। শ্রমিকদের প্রতি তারা সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হন।
শ্রেণিশত্রু খতম করার স্লোগানে জামায়াত বিশ্বাসী নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, লাল পতাকাওয়ালারা বলতো শ্রেণি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রেণিশত্রু খতম করতে হবে। এই শ্রেণিশত্রু কারা? যারা মালিক এবং উদ্যোক্তা তারা! তো মালিক আর উদ্যোক্তা যদি না থাকে শ্রমিক কাজ করবে কোথায়? তার কর্মসংস্থান হবে কোথায়? আমরা সমন্বয় করতে চাই। শ্রমিক মালিক ভাই ভাই একে অন্যকে সম্মান করবে ভালোবাসবে। শ্রমিক তার কর্মসংস্থানের জন্য মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে। আন্তরিকভাবে কাজ করবে। আবার মালিক একথা মনে করবে যে তার পুঁজি আর তার যন্ত্রপাতি অচল যদি এই শ্রমিক না থাকে। শ্রমিক বাঁচলে মালিক বাঁচবে, শিল্প বাঁচবে। শ্রমিক যদি না বাঁচে শিল্পেরও মৃত্যু হবে।
‘বিগত নির্বাচনে জাতিকে আমরা বলেছিলাম নেতৃত্ব আমরা তরুণ এবং যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। জামায়াতে ইসলামী থেকে যারা বিভিন্ন জায়গায় আমাদের প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের শতকরা ৭০ ভাগের বয়স হচ্ছে ৪২ বছরের নিচে। আমরা তার প্রমাণ রেখেছি। আর আজকেও এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে একজন যুবকের হাতে আমরা মূল চাবিটা তুলে দিলাম। আমরা চাই যৌবনের এই শক্তি জাতি গঠনের কাজে লাগুক।’
সরকারের কাছে স্পষ্ট দাবি জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, শ্রমিকরাও এই সমাজের নাগরিক। ভোট শ্রমিকরাও আমাদেরকে দেয়। আপনাদেরকেও দিয়েছে। সুতরাং শ্রমিকদের সব বিষয় মালিকদের ঘাড়ের উপর ঠেলে দেবেন না। রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মালিকরা ইনসাফের ভিত্তিতে তাদের যা করণীয় তা করবে। বাকিটা রাষ্ট্রকে শেয়ার করতে হবে। শ্রমঘন এলাকায় কোনো বিশেষায়িত হসপিটাল নেই। দুই একটা সাধারণ হাসপাতাল থাকলেও সেগুলো চাহিদার তুলনায় কিছুই না।
আমরা দাবি করব, শ্রমঘন এলাকাগুলাতে অবশ্যই মানসম্মত সাধারণ হাসপাতাল যেমন থাকবে তেমন বিশেষায়িত হাসপাতালও সরকারকে গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিকদের চিকিৎসা সংগতভাবেই এর ব্যয়ভার সরকার এবং মালিক পক্ষকে শেয়ার করে বহন করতে হবে। কারণ শ্রমিকদেরকে যা বেতন ভাতা দেওয়া হয় তা দিয়ে পেটের যোগানই হয় না, চিকিৎসার খরচ বাঁচাবে কোত্থেকে? পাশাপাশি শ্রমিকদের সন্তানদেরকে মানুষ করা শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে শুধু সরকারকেই নিতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মুক্তির ময়দানে লড়াই হবে। আমাদের অধিকার, জনগণের অধিকার, আবার পায়ের তলায়পিষ্ট করার পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। আমরা সংসদ থেকে বের হয়ে এসেছি। কিন্তু আমরা আবার সংসদে ফিরে যাব। মাঝখানে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের মুক্তির আন্দোলন আমরা গড়ে তুলব। এই আন্দোলনের জনগণের অধিকারের ব্যাপারে আমরা সরকার কিংবা যেকোনো কর্তৃপক্ষকে ইনশাআল্লাহ চুল পরিমাণ ছাড় দেব না।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সদ্য বিদায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আ ন ম শামুসল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান, এনসিপির আহবায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান প্রমুখ।