সিলেট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ের পর বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার। নতুন সরকারের কার্যক্রমও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এদিকে মন্ত্রিসভা গঠনের পর সবার দৃষ্টি এখন সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের দিকে। নারী আসনগুলো নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে তোড়জোর।
সংরক্ষিত এসব আসনে মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতারা। সবাই নিজের মত করে লবিংয়ে ব্যস্ত। তবে বিগত দিনগুলোতে আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব নারী রাজপথে ছিলেন তারাই সংরক্ষিত নারী আসনের দাবিদার— এমনটিই দাবি করেছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের একাধিক নেত্রী।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার এই চার জেলা থেকে দু’জন সংরক্ষিত নারী এমপি নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে এই দু’টি আসন নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে চলছে নীরব প্রতিযোগিতা। এসব আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে অন্তত আটজন নারীর নাম দলীয় হাইকমান্ডের টেবিলে ঘুরছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া, তৃণমূলের আলোচনায়ও চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। কে পাচ্ছেন গ্রিন সিগন্যাল সেটি নিয়েও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে দলীয় প্রধানের ঘনিষ্ঠ বিশেষ টিম।
দলীয় সূত্র বলছে, মন্ত্রিসভা গঠন হওয়ার পর থেকেই সরব হয়েছেন সম্ভাব্য নারী প্রার্থীরা। এরই মধ্যে বেশিরভাগ প্রার্থী কেন্দ্রে জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন। কেউ কেউ দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় উপস্থিতি দেখাচ্ছেন, আবার কেউ সংগঠনের অতীত ভূমিকা তুলে ধরছেন বিভিন্ন মহলে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে দলের হাইকমান্ডের ওপর।
সিলেটে সংরক্ষিত নারী আসনে আলোচনায় যারা
শাম্মী আকতার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই নেত্রী সিলেট বিভাগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। তিনি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির স্থানীয় সরকারবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক। শাম্মী আকতার বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও পরিচিত মুখ। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে তার ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মত। তার পক্ষে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সরব।
সামিরা তানজিন চৌধুরী
সংরক্ষিত নারী আসনের এমপির তালিকায় যে ক’জনের নাম আলোচনায় রয়েছে তাদের মধ্যে শীর্ষে অবস্থান করছেন সামিরা তানজিন চৌধুরী। প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব বহুল আলোচিত হারিছ চৌধুরীর কন্যা সামিরা তানজিন। তিনি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সিনিয়র কোর্টের প্র্যাকটিসিং সলিসিটর এবং মানবাধিকার, সিভিল লিটিগেশন ও গভর্ন্যান্স বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। সামিরা চৌধুরীর পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য তার বড় শক্তি। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে দীর্ঘ আইনি অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি দলের ত্যাগী রাজনীতির উত্তরসূরি। তৃণমূলেও রয়েছে তাদের রাজনৈতিক কদর।
সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে সামিরা বলেন, ‘দলের প্রধান আমাকে দায়িত্ব দিলে নারী ক্ষমতায়ন, আইনের শাসন ও স্বচ্ছ প্রশাসন প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে চাই। আমার বাবা মরহুম হারিছ চৌধুরীর অপূরণীয় কাজ আমি বাস্তবায়ন করে যেতে চাই। আমি শতভাগ আশাবাদী, দল আমার বাবার রাজনৈতিক জীবনের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন করবে।’
সৈয়দা আদিবা হোসেন
সিলেট-৬ আসনের দুই বারের সাবেক এমপি প্রয়াত ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন (লেচু মিয়া)-এর কন্যা সৈয়দা আদিবা হোসেনও সম্ভাব্যদের তালিকায় শীর্ষে রয়েছেন। তিনি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করে পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান টাম্পাকো গ্রুপের পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছেন। এ ছাড়াও, এলাকার অবহেলিত জনপদে শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।
মকবুল কন্যা আদিবা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাবা এলাকায় নিজ অর্থে অনেক শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়াও রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভাট নির্মাণসহ ব্যাপক উন্নয়ন করে গেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাবার কাছ থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও জনসেবার শিক্ষা নিয়েছি। গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার অঞ্চলের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আছি। দল সুযোগ দিলে নারী উন্নয়ন ও তরুণ প্রজন্মকে বিশ্ব দরবারে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ নিতে চাই।’
জেবুন নাহার সেলিম
জেবুন্নাহার সেলিম। জেলা মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। সিলেট-৪ আসনের সাবেক এমপি মরহুম দিলদার হোসেন সেলিমের সহধর্মিণী। দিলদার হোসেন সেলিম বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ছিলেন। এ কথাটা তার দল ছাড়াও অন্যান্য দলের নেতা কর্মীরাও অকপটে স্বীকার করেন।
জেবুন্নাহার সেলিমও দীর্ঘদিন জেলা রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় অভিজ্ঞ প্রার্থী হিসেবে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে কাজ করতে চান। তৃণমূল নেতাকর্মীরও চায় দল থাকে মূল্যায়ন করুক।
তাহসিন শারমিন তামান্না
তাহসিন শারমিন তামান্না। সিলেট জেলা মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা বিএনপির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বহুল আলোচিত ইলিয়াস আলীর সঙ্গে গুম হওয়া সিলেট জেলা ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের একমাত্র ছোট বোন।
২০১২ সালের এপ্রিল মাসে ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনার গুম হওয়ার পর দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে দলের সঙ্গে মাঠে সক্রিয় আছেন তিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে ব্যাপক নির্যাতন হয়রানির মুখোমুখি হলেও মাঠ ছাড়েননি এই নেতা। তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে রয়েছে দিনার পরিবারের আলাদা কদর। তাদেরও দাবি— গুম হওয়া পরিবারকে এসব আসন উপহার দিয়ে মূল্যায়ন করতে পারেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সাবিনা খান পপি
আলোচনায় আছেন লন্ডন টাওয়ার হ্যামলেটেস’র কাউন্সিলর সাবিনা খান পপি। তিনি যুক্তরাজ্য বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত কমর উদ্দিনের কন্যা। রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা সাবরিনা দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্য বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তিনিও তার বাবার মতো বিএনপির আদর্শের পথ ধরে আমৃত্যু জনসেবা করে যেতে চান। পিতার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনিও তারেক রহমানের নতুন সরকারে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের নারী উন্নয়ননে কাজ করতে চান।
ফাহিমা কুমকুম
জাতীয়তাবাদী মহিলা দল সিলেট মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট জেলা বিএনপির সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ফাহিমা কুমকুম। তিনি সিলেট সোসিও ইকনোমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কুমকুম নির্ভীক সমাজসেবী ও সংগঠক হিসেবে অসহায় নারী ও শিশু নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে যাচ্ছেন। দলের দুর্দিনে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন সোচ্চার। তিনিও আশাবাদী যে, দল তাকে মূল্যায়ন করবে। তিনিও তারেক রহমানের নতুন সরকারে অংশ নিয়ে নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করতে চান।
এ ছাড়া, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাদিয়া চৌধুরী মুন্নি, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি সামিয়া বেগম চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সাবেক এমপি মরহুম নজির হোসেনের সহধর্মিণী সালমা নজির ও অ্যাডভোকেট রোকসানা বেগম শাহনাজের নামও বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় ত্যাগ, সাংগঠনিক ভূমিকা, পারিবারিক ও রাজনৈতিক ঐতিহ্য এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ- সব মিলিয়ে তাদের প্রত্যেককে ঘিরেই আলাদা-আলাদা সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
তবে, তৃণমূল নেতাকর্মীরা বলছেন ভিন্ন কথা। বিগত ১৭ বছরে যারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছেন, হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন, সাংগঠনিক ত্যাগ স্বীকার করেছেন শেষ পর্যন্ত- দল তাদের মূল্যায়ন করবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জিকে গৌছ সারাবাংলাকে বলেন, ‘সংরক্ষিত আসনে কয়জন নারী এমপি হবেন তা দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক ফোরাম দেখবে। তাছাড়া, সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন নির্ধারণে শুধু রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং সাংগঠনিক অবদান, ত্যাগ, আন্দোলন সংগ্রামে ভুমিকার সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হব।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীও একই সুরে সারাবাংলাকে বলেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা আশা করি, সিলেট থেকে যোগ্য এবং দলের দুঃসময়ে ত্যাগ ও নিবেদিত যিনি ছিলেন, তিনিই আগামীতে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য হবেন।’
উল্লেখ্য, জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ায় সংরক্ষিতের ক্ষেত্রে বেশি আসন পাবে বিএনপি, দ্বিতীয় জামায়াত ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।