ঢাকা: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বাকি আর মাত্র ৩৬দিন। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই শেষে এখন চলছে আপিল প্রক্রিয়া। এর পর প্রতীক প্রদানের মধ্য দিয়ে শুরু হবে নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা। যদিও ভোটের প্রক্রিয়ার আগেই প্রচার-প্রচারণা ও শক্তিমত্তার জানান দিতে দল ও জোটগুলো মাঠে নেমেছে। ভোটের রাজনীতিতে এখন দু’টি জোটের ঘূর্ণিপাকে বাংলাদেশ। একদিকে জামায়াত-চরমোনাই, অন্যদিকে বিএনপি ও শরিক। এই দুই জোটের কোনটি শক্তিশালী, আর কারা দুর্বল তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। রাজনৈতিক মহলেও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয় নতুন সমীকরণ। জামায়াত-বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটের অবসান হয়ে রাজনীতি ভাগ হয়ে যায় দুই শিবিরে। অভ্যুত্থানের পর পরই বিএনপির কাছ থেকে দূরে সরে যায় জামায়াত। তারা সঙ্গী হিসেবে পায় চরমোনাই পীরকে। দলগুলোকে কাছে টানতে উঠে-পড়ে লাগে বিএনপি ও জামায়াত। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের প্রথম সফলতা আসে চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। অপরদিকে বিএনপিও কতগুলো ছোট দলকে কাছে রাখতে সমর্থ হয়।
এরই মধ্যে গত ১১ডিসেম্বর ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়। তফসিলের পর ছোট ছোট দলের নেতাদের কাছে টানতে মরিয়া হয়ে ওঠে বিএনপি ও জামায়াত। একইসঙ্গে ছোট দলগুলোর নেতারাও এমপি হওয়ার দৌড়ে নিজেদের শামিল করার জন্য ধর্না দেন বড় দলের নেতাদের কাছে। শেষ পর্যন্ত এবারের নির্বাচনের দৌড় দু’টি জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
একটি জোটের নেতৃত্বে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় দল বিএনপি। অপরটিতে জামায়াত-চরমোনাইসহ ১১ দল একাট্টা হয়েছে। এরই মধ্যে ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা, ১ থেকে ৪ জানুয়ারি যাচাই বাছাইও হয়ে গেছে। কিন্তু দুই জোটের কেউ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে পারেনি। আসন সমঝোতা না করতে পারাই এর মূল কারণ। শেষ মুহূর্তে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। হয়তো দুই/চার দিনের মধ্যে দু’টি জোটই সমঝোতায় পৌঁছাবে এবং চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। তারপর শুরু হবে ভোট যুদ্ধ।
কোন জোটে কারা আছেন
বিএনপি জোটে এবার যুক্ত হয়েছে মোট সাতটি দল। এর মধ্যে আছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেপি)।
আর দল বিলুপ্ত করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সৈয়দ এহসানুল হুদা। তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে। ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি) একাংশের চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন নড়াইল-২ আসন থেকে। তেমনি এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ নির্বাচনি কৌশল হিসেবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন ঢাকা-১৩ আসনে। তবে ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ ও ববি হাজ্জাজ কেউ-ই দল বিলুপ্ত করেননি। তারা পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন।
অপরদিকে দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ তিনি পেয়েছেন কুমিল্লা-৭ আসন। আর গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান দল ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে পেয়েছেন ঝিনাইদহ-৪ আসন।
জোটের দলগুলোকে বিএনপি যেসব আসন ছেড়েছে এর মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ (একাংশ) পাঁচটি আসন পেয়েছে। আসনগুলো হলো সিলেট-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, নীলফামারী-১, নারায়ণগঞ্জ-৪ ও যশোর-৫। তারা খেজুর গাছ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূর পটুয়াখালী-৩ আসনে ট্রাক প্রতীকে, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া-২ আসনে কেটলি প্রতীকে নির্বাচন করবেন। আর বিজেপির আন্দালিভ রহমান পার্থ ভোলা-১ গরুরগাড়ি প্রতীকে, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঢাকা-১২ আসনে কোদাল প্রতীকে, গণসংহতি আন্দোলনের জুনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসন থেকে মাথাল প্রতীকে নির্বাচন করবেন।
জামায়াত-চরমোনাই জোটে কারা আছেন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মসজিল, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। এই জোটের কোন দল কত আসনে নির্বাচন করবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। দলের নেতারা বলেছেন, খুব শিগগিরই আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হবে।
ভোটের মাঠে কোন জোটের অবস্থান কেমন
দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ দিন রাজত্ব করে আসছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সেই সঙ্গে ছিল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি। এই চারটি দলের মধ্যে ক্ষমতার রাজনীতি গত ৫৪ বছর ঘুরপাক খেয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশের রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি। রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের অবর্তমানে দেশে যে চার/পাঁচটি দলের ভোটের মাঠে শক্ত অবস্থান রয়েছে সে হিসেবে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এনসিপি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নাম আসে।
এর মধ্যে জামায়াত-চরমোনাই জোটে চারটি বড় দল থাকলেও বিএনপির সঙ্গে রয়েছে একটি দল। সে হিসাবে জোটে বিএনপি যেমন একক বড় দল। তেমনি জামায়াতের সঙ্গে এনসিপি-চরমোনাই যোগ হয়ে বেশ শক্তি অর্জন করেছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। ফলে এই জোটের একক প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপি জোটের প্রার্থীর বিজয়ী হতে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে।
জরিপের ফলাফল যা বলছে
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে কয়েকটি দেশি-বিদেশি সংস্থা অনেকগুলো জরিপ পরিচালনা করেছে। এসব জরিপের ফলাফলও প্রকাশ করেছে তারা।
মার্কিন ফেডারেল সরকারের অর্থায়নে রিপাবলিকান পার্টি-ঘনিষ্ঠ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) একটি জরিপের ফল প্রকাশ করেছে গত ২ ডিসেম্বর। সেই জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে বিএনপি ৩০ শতাংশ, জামায়াত ২৬ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬ শতাংশ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে ভোট দেবেন ৪ শতাংশ ভোটার।
এই জরিপটি পরিচালনা করে ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। জরিপে জোটের বাইরে থাকা জাতীয় পার্টিকে ৫ শতাংশ মানুষ ভোট দেবে বলে জানায়। এখানে ছোট দলগুলোর ভোটের হিসাব দেখানো হয়নি। ফলে দেখা যায়, জামায়াত জোটের দলগুলোর পক্ষে সমর্থন রয়েছে ৩৬ শতাংশ মানুষের। অপরদিকে বিএনপির এককভাবে রয়েছে ৩০ শতাংশ মানুষের ভোট।
গতবছর ৮ ডিসেম্বর একটি জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো। এটি তাদের নিজস্ব জরিপের ফল। প্রশ্ন ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন দল সবচেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করবে। জবাবে বিএনপির পক্ষে ৬৫ দশমিক শূন্য ৯, জামায়াতে ইসলামীর ২৫ দশমমিক শূন্য ৯, এনসিপির শূন্য দশমিক শূন্য ৮ ও আওয়ামী লীগের পক্ষে ৭ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ মত দিয়েছে।
আর সম্প্রতি ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন?– এ প্রশ্নে ১২ শতাংশ বিএনপি, ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ জামায়াতে ইসলামী এবং ২ দশমিক ৮০ শতাংশ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কথা বলেছেন।
একই সংস্থার গত অক্টোবরে চালানো জরিপে একই প্রশ্ন করা হলে ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপি, ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ জামায়াত এবং ২ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এই জরিপে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্য কোনো দলের নাম আসেনি।
গতবছর ৭ জুলাই বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেম তাদের জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৩৮ দশমকি ৭৬ শতাংশ ভোট পাবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাবে ২১ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভোট। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পাবে ১৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ, জাতীয় পার্টি পাবে ৩ দশমিক ৭৭ শতংশ, অন্য ধর্মীয় দলগুলো পাবে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোট।
এদিকে সোমবার (৫ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর ফার্মগেটে কেআইবি মিলনায়তনে বেসরকারি সংস্থা এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি)-এর জরিপ উপস্থাপন করা হয়েছে। সেই জরিপে উঠে এসেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে যাচ্ছেন। আর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এই জনমত ১৯ শতাংশ। জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির পক্ষে মত দিয়েছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের ২০ ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত জরিপটি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
জানতে চাইলে রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকার সামাজিক বিজ্ঞান ও কলা অনুষদের ডিন ড. আবু বকর সিদ্দিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের রাজনীতিতে দু’টি ধারা হয়ে গেছে। একটি ধারা জামায়াত-চরমোনাইপন্থী জোট তারা ভারতবিরোধী। অপর ধারাটি বিএনপির নেতৃত্বে, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। দু’টি জোটেই অনেক সম্ভাবনাময় প্রার্থী রয়েছেন। কেউ কারও চেয়ে কম না। তাদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী জামায়াত জোটের নবীন প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।’
তিনি বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের অনেক ভোটারও ইসলামী জোটের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। অপর দিকে বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যূতে বিএনপি একটা সহানুভূতি পাবে। এটা কাজে লাগাতে পারলে তারাও ভালো ফলাফল করতে পারে। তবে ফলাফল দুই জোটের ব্যবধান বেশি হবে না বলে আমি মনে করি।’
একটি আসনের উদাহরণ দিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি বলেন, ‘নরসিংদী-২ আসনে আমি ব্যক্তিগতভাবে সাধারণ জনগণের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান হেভিওয়েট প্রার্থী। কিন্তু নতুন হিসেবে জামায়াতের প্রার্থী অনেক এগিয়ে ছিল। তবে জোটের কারণে এনসিপির যে প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি মঈন খানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারবেন বলে মনে হয় না।’