কক্সবাজার: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শাহপরীর দ্বীপের উপকূলজুড়ে কয়েক দিন ধরে বিরাজ করছিল উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তা। সাগরে যাওয়া ১৪ জন জেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিলেন তাদের স্বজনরা। শেষ পর্যন্ত তিন দিন পর মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হেফাজত থেকে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরেন তারা।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) গভীর রাতে তারা ফিরে আসেন।
ফিরে আসা জেলেদের অভিযোগ, আটক থাকার সময় তাদের শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
জেলেরা জানান, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সেন্ট মার্টিন সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে ফেরার পথে হঠাৎ জোয়ারের তীব্র স্রোতে দিক হারিয়ে ফেলেন তারা। একপর্যায়ে না বুঝেই ঢুকে পড়েন নাফ নদীর নাখাইংদিয়া এলাকায়। যা মিয়ানমারের জলসীমার মধ্যে পড়ে। সেখানেই তাদের পথরোধ করে আরাকান আর্মির সদস্যরা। তিনটি মাছ ধরার নৌকাসহ জেলেদের একটি ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তী তিন দিন তারা কাটান অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও দুর্ভোগের মধ্যে।
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) বিকেলে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম ঘাটে ভিড়ে তাদের নৌকা।
ফিরে আসা ১৪ জেলের মধ্যে রয়েছেন মাঝেরপাড়া ও ডাঙ্গারপাড়ার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান, ফরিদ হোসেন, রাবিউল হাসান, আবুল কালাম, মীর কাসেম আলী, গিয়াস উদ্দিন, সালাউদ্দিন, মহিউদ্দিন, হোসেন আহমেদ, মোল্লা কালু মিয়া, আবু তাহের, আব্দুল খালেক, জাবের মিয়া ও রহিম উল্লাহ।
ফেরার পর সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা বুঝতেই পারিনি কখন সীমান্ত পার হয়ে গেছি। পরে তারা আমাদের আটক করে এবং মারধর করে।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মহিউদ্দিনও। তিনি বলেন, তিন দিন অনেক কষ্টে ছিলাম। কখন ছাড়বে, সেই অপেক্ষায় ছিলাম।
স্থানীয় প্রশাসন বলছে, শুরু থেকেই বিষয়টি তাদের নজরে ছিল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে জেলেদের ফেরানো সম্ভব হয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ এনামুল হাফিজ নাদিম বলেন, সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যায়, সে জন্য নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এবং জেলেদের নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে।
স্থানীয় জেলে সংগঠন ও বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, গত দেড় বছরে ৪০০ জনের বেশি জেলে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মির হাতে আটক হয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২৫০ জন দেশে ফিরেছেন।
এর মধ্যে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি একযোগে ৭৩ জন জেলে ফিরে আসেন। বিজিবির প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সময়ে ১৮৯ জন জেলে ও ২৭টি ট্রলার উদ্ধার করা গেলেও এখনো রাখাইন রাজ্যে অন্তত ১৭২ জন জেলে ও ৩২টি ট্রলার আটকা রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তাই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের দাবি উঠছে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে। তাদের ভাষ্য, জীবিকার তাগিদে সাগরে যেতে হয়। কিন্তু প্রতিবারই জীবন নিয়ে ফেরার অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।