ঢাকা: দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর এবং যথাযথ নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে সেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে মনে করে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে আইপিডি’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নিয়োগ জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করবে। শুধুমাত্র সরকারদলীয় এই সকল নিয়োগ স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করতে পারে, যা নবগঠিত সরকারের জন্য বিব্রতকর হতে পারে। রাজনৈতিক প্রশাসক নিয়োগ স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য ও জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে বলে মনে করে আইপিডি।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর মেয়র, চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলরদের পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৭ উপজেলা পরিষদ এবং ৬৪টি জেলা পরিষদের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হবার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
আইপিডি বিশ্বাস করে, এই ভোগান্তি নিরসনে অতি দ্রুত সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেবার কোনো বিকল্প নেই। বিগত সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন আয়োজন না করে জনভোগান্তিকে দীর্ঘায়িত করেছে। স্থানীয় সরকারে পুনরায় প্রশাসক নিয়োগ এই অচলাবস্থা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
বস্তুত নির্বাচিত মেয়রের বদলে সরকার সিটি করপোরেশনে প্রশাসক বসালেও সিটি করপোরেশনগুলোতে কাউন্সিলর না থাকায় নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে না। মূলত ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয় থেকে বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সেবা দেওয়া হয়। অতি দ্রুত নির্বাচন না হলে কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে এই সংকট আরও দীর্ঘায়িত হবে। কাউন্সিলর না থাকায় নাগরিকদের নিত্যদিনের সমস্যা- যেমন জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো মেরামত ইত্যাদি- দ্রুত সমাধান হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ভোগান্তি বাড়ছে। কোনো অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা থাকলেও তা নির্বাচিত প্রতিনিধির বিকল্প হতে পারে না। একইসঙ্গে স্থানীয় সরকারকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করবার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছে, সেই প্রস্তাবনাগুলো বহাল রাখবার বিষয়টি বিবেচনা করবার জন্য নির্বাচিত সংসদকে অনুরোধ করছে আইপিডি। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্দলীয় চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখা গণতন্ত্রের স্বার্থেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইপিডি মনে করে, সকল ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে স্থানীয় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। বিগত সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ও স্বতন্ত্র অনেক প্রার্থীর করা নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগ এর এখন পর্যন্ত সদুত্তর পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক মহলে ও জনগণের কাছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনকে কোনো ধরনের দলীয় প্রভাবমুক্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনে যথাযথ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে এর কোনো বিকল্প নেই।
আইপিডি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের অধীনেই স্থানীয় সরকার পরিচালিত হতে হবে। অতএব, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।
আইপিডি সরকারের প্রতি নিম্নোক্ত আহ্বান জানাচ্ছে,
- সিটি করপোরেশন, পৌরসভাসহ দ্রুত সকল পর্যায়ের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করা।
- দলীয় প্রতীকমুক্ত নির্বাচনের বিষয়টি নিশ্চিত করা।
- অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে স্বল্পমেয়াদি ও সীমিত রাখা।
- স্থানীয় সরকারের নির্দলীয় ও গণমুখী চরিত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
- স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রাখা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় আচরণ নিশ্চিত করা।
স্থানীয় সরকারকে নির্বাচিত, জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা জবাবদিহিমূলক করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন, অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনা ও কার্যকর নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলে আইপিডি মনে করে।