ঢাকা: দেশের দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর আর্থিক সংকট নিরসন এবং সামাজিক সুরক্ষা বলয়কে আরও শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালুর চূড়ান্ত উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে এই কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের লক্ষ্য ও সুবিধা
এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো নির্বাচিত পরিবারগুলোকে নিয়মিত নগদ অর্থ সহায়তার আওতায় আনা। তবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো নারীর ক্ষমতায়ন। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, সহায়তার অর্থ সরাসরি পরিবারের নারী সদস্য বা গৃহকর্ত্রীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার তুলনায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’র আওতায় সহায়তার পরিমাণ হবে অনেক বেশি। এ ছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং প্রকৃত হকদারদের কাছে টাকা পৌঁছে দিতে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
আবেদন প্রক্রিয়া ও তথ্য সংরক্ষণ পদ্ধতি
অনিয়ম, ভুয়া তালিকা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে সরকার অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ভিত্তিতে একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেস তৈরি করা হবে। প্রতিটি পরিবারের বিস্তারিত তথ্য সেখানে সংরক্ষিত থাকবে, যাতে একই পরিবার একাধিক সুবিধা না পায় বা কোনো জালিয়াত চক্র সুবিধা নিতে না পারে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই কার্যক্রম শুরু হবে। এরপর স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে উপকারভোগীদের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে তা সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হবে।
আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
যদিও সরকার এখনো পূর্ণাঙ্গ আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করেনি, তবে সাধারণ মানুষকে আগাম প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। সম্ভাব্য আবেদনকারীদের নিচের নথিপত্রগুলো সংগ্রহে রাখতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে-
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)।
- পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- একটি সচল মোবাইল নম্বর।
কোথায় এবং কীভাবে আবেদন করবেন?
পাইলট কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে সরাসরি আবেদন ফরম সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া ঘরে বসে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে একটি ডেডিকেটেড অনলাইন পোর্টাল চালুর প্রস্তুতিও চলছে।
উল্লেখ্য, প্রতিটি পরিবারে একটি করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ইস্যু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমেই মাসিক নগদ সহায়তা অথবা ক্ষেত্রবিশেষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা হবে।
১৫ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ তদারকি ও বাস্তবায়ন করতে ১৯ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ১৫ সদস্যের এই মন্ত্রিসভা কমিটিতে অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করা হয়েছে।
কমিটির অন্যান্য সদস্যরা হলেন- সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন ও উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এ ছাড়াও কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ মহিলা ও শিশুবিষয়ক সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব, অর্থ সচিব, আইসিটি সচিব, স্থানীয় সরকার সচিব, পরিকল্পনা সচিব এবং সমাজকল্যাণ সচিব।
সরকার আশা করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলো সরাসরি উপকৃত হবে, যা দেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে।