ঢাকা: ২১ ফেব্রুয়ারি, বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসে রক্তস্নাত একটি দিন। দিনটিকে প্রতিবছর মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে সমগ্র জাতি। পলাশ-শিমুল ফোটার এই দিনে বাঙালি জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে সেইসব বীর শহিদদের, যারা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২ সালের এই দিনে অকাতরে প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছিলেন। প্রতিবছরের মতো এবারও বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে ধ্বনিত হচ্ছে সেই কালজয়ী গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’
বায়ান্নর সেই উত্তাল দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাজপথে নেমে আসা ছাত্রদের ওপর তৎকালীন শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে পুলিশের নির্মম গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে রচিত হয়েছিল রক্তস্নাত এক ইতিহাস। আজ সেই গৌরবোজ্জ্বল ভাষা আন্দোলনের ৭৪ বছর পূর্ণ হলো। সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর ও জব্বারসহ নাম না জানা শহিদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি আমাদের মায়ের ভাষা। এই আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে, যা আজ সারা বিশ্বে পালন করা হচ্ছে।
একুশের প্রথম প্রহর রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের বেদিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়েছে। অমর একুশে উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি এবং আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষ্যে শনিবার সরকারি ছুটি। আজ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবনে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। এ ছাড়া, উত্তোলন করা হবে কালো পতাকা। দিবসটি উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা বাণী দিয়েছেন।
বাংলাদেশের স্বাধিকার, মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অমর একুশের চেতনা অফুরন্ত প্রেরণা ও অসীম সাহস জুগিয়েছে উল্লেখ করে বাণীতে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উত্স। ভাষা একটি জাতির অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক।’
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি, বরং বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে মজবুত ও সুদৃঢ় করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা ভাষা শহিদ এবং একাত্তর সালে স্বাধীনতা অর্জন ও ২০২৪-এর স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এযাবত্কালে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সব শহিদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চাই।’
একুশের ভোরে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরিসহ আজিমপুর কবরস্থানে শহিদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবে ও শ্রদ্ধা জানাবে সর্বস্তরের জনতা। দেশের সব মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে আজ। দিবসটির তাত্পর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সব স্যাটেলাইট চ্যানেলে অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। সংবাদপত্রে থাকছে বিশেষ আয়োজন।
অমর একুশে বক্তৃতার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। সকাল ১১টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে বক্তব্য দেবেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপ্রধান হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এর আগে সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত নজরুল মঞ্চে কবি আবদুল হাই শিকদারের সভাপতিত্বে চলবে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর।
ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটেও থাকছে বিশেষ আয়োজন। সকাল সাড়ে ১০টায় ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে একক ও সম্মেলক গান, পাঠ-আবৃত্তি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাংলা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও বিদেশি ভাষার কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।
বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য এই দিনটি একই সঙ্গে শোক ও অপরিসীম গৌরবের। মাতৃভাষার জন্য প্রাণদানের এমন নজির বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে ভাষা শহিদদের স্মরণ করার পাশাপাশি বাংলা ভাষার মর্যাদা সমুন্নত রাখার শপথ নিচ্ছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি আলাদা রাষ্ট্র হয়। পাকিস্তানের জন্মের শুরুতেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দিতে উদ্যত হয়। পাকিস্তানের জন্মের শুরুতেই ভাষার ওপর আঘাত, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। সেই আশাভঙ্গের বেদনা থেকেই পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বাঙালির ভাষাভিত্তিক চেতনা, সচেতনভাবে আত্মপরিচয় ও শিকড়ের অন্বেষণের যাত্রা। উন্মেষ ঘটে জাতীয়তাবাদের।
বাঙালির সঙ্গে ভাষা নিয়ে চলা এ লড়াইয়ের চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিজুড়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন ও সংগ্রামমুখর ছিল পূর্ব বাংলার মানুষ। আন্দোলন দমনে পুলিশ ঢাকা শহরে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলনে শহিদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ নাম না জানা আরও অনেকে। তাদের রক্তের বিনিময়েই পরে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই পথ দেখায় এ অঞ্চলের মানুষকে। দুই দশকে একের পর এক আন্দোলন রূপ নেয় স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনায়। এরই পথ ধরে ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। শুরুতে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও পরে দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবেও খ্যাত হয়। ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। এদিন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকে দিনটি বিশ্বের সব দেশে পালিত হয়ে আসছে।