ঢাকা: সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত বিল বাতিলের ফলে দেশের বিচার বিভাগ এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন বিশিষ্ট বিচারপতি, আইনজীবী ও বিশ্লেষকরা।
শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল হতে লেগেছে ৫৫ বছর, স্বাধীনতা আর কতদূর?’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন এবং আইন ও বিচার পত্রিকার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ আলোচনায় সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আপিল বিভাগের বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, সংবিধানে বারবার সংশোধনের ফলে এর মৌলিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তা সংস্কার এখন সময়ের দাবি। তিনি সতর্ক করে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা অস্বীকার করা হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তিনি আরও বলেন, অধ্যাদেশ রহিত করার মাধ্যমে সরকার কার্যত জুলাইয়ের চেতনাকে উপেক্ষা করেছে এবং এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির সমালোচনাও করেন তিনি।
সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন বলেন, বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে এ ধরনের পদক্ষেপ দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে। তার মতে, বিচারক নিয়োগে যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা আবারও জোরদার হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক বলেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিতর্কের নতুন ক্ষেত্র তৈরি করবে।
অন্যদিকে ব্যারিস্টার হাসান তারিক চৌধুরী অভিযোগ করেন, স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার বদলে সরকার নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো বজায় রাখতে আগ্রহী যা আইনের শাসনের জন্য হুমকি।
ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে গৃহীত অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে জনগণের কী উপকার হলো, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
সাবেক যুগ্ম জেলা জজ ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন মনে করেন, এই সিদ্ধান্ত সরকারের জন্যই বুমেরাং হতে পারে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্জনের পথ আরও জটিল হয়ে উঠবে।
জুলাই ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, বিচার বিভাগের বর্তমান ভূমিকা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি স্বাধীন ও বৈষম্যহীন বিচার ব্যবস্থার দাবি জানান।
সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, এই বিল রহিতকরণের ফলে গণতন্ত্র চর্চা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আদালতকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়বে। এতে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা কমে যেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।