Thursday 09 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

লেবাননে হামলা অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতিতে ‘বাধা’ হয়ে দাঁড়াতে পারে ইসরায়েল

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৭ | আপডেট: ৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০০

যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর তেহরানে পতাকা নাড়ছেন এক ব্যক্তি। ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে দুই সপ্তাহ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধে আগামী ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে দুই দেশ। তবে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরও লেবাননে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধে একটি চুক্তি করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাত আটটা পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সময়সীমা না মানলে ইরানের ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন তিনি। তবে সময় শেষের ঘণ্টা দুয়েক আগেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে দুই পক্ষ থেকে।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধবিরতি দুই সপ্তাহের জন্য হলেও তা আপাতত পুরো বিশ্বে স্বস্তি এনেছে। কারণ, এ যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ১২০ ডলারে ঠেকেছিল। যুদ্ধবিরতির খবরে তা এক ধাক্কায় কমে ৯২ ডলারে এসেছে। চাঙা হয়েছে বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারও।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পর তেহরানে চলাচল করছেন সাধারণ মানুষ। ছবি: রয়টার্স

এ স্বস্তির মধ্যে যুদ্ধবিরতির সময় লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ। কারণ, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর গতকাল বুধবার রাত পর্যন্ত লেবাননে ২৫৪ জনকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আর আল জাজিরাকে একটি সূত্র জানিয়েছে, লেবাননে হামলা চলতে থাকলে যুদ্ধবিরতি থেকে সরে ইসরায়েলে হামলার কথা বিবেচনা করতে পারে ইরান।

যুদ্ধ শুরুর পর বুধবার (৮ এপ্রিল) লেবাননে সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে ১০ মিনিটে বৈরুতসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০০টি বিমান হামলা হয়। হাসপাতালগুলো ভরে যায় রক্তাক্ত মানুষে। লেবানন থেকে জাতিসংঘের কর্মকর্তা ইমরান রেজা বলেন, হামলায় এত মানুষ আহত হচ্ছেন, যা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা লেবানন সরকারের নেই।

এ অবস্থায় হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিবিসি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানিয়েছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ রয়েছে। আর এএফপি ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরসের (আইআরজিসি) বরাতে জানিয়েছে, হরমুজের কয়েকটি বিকল্প পথে জাহাজ চলতে পারে।

এমন হামলার মধ্যে সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতি মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যে পোস্ট দিয়েছিলেন, তাতে উল্লেখ করা হয়েছিল, লেবাননসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। লেবাননে হামলা শান্তিপ্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন শাহবাজ শরিফ। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, কানাডা, ডেনমার্ক, স্পেনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নেতারাও যৌথ বিবৃতি দিয়ে সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ কাজ করছে। তারা এ ব্যাপারে খুশি হতে পারছেন না। ইসরায়েলি একটি সূত্র সিএনএনকে এমন তথ্য দিয়েছে।

সূত্রটি বলেছে, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথ অনুসরণ করে যুদ্ধবিরতি মেনে চলবে। তবে ইসরায়েল এটি অনিচ্ছা নিয়েই করবে। কারণ, তাদের এমন কিছু লক্ষ্য এখনো অপূর্ণ থেকে গেছে, যা তারা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে অর্জন করতে চায়।

মার্চের মাঝামাঝি সময়ে সিএনএনের পক্ষ থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলে ইসরায়েল হামলা বন্ধ করবে কি না। নেতানিয়াহু সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, ট্রাম্পই ‘নেতা’ এবং তিনি ‘তার মিত্র’।

‘যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়’—এই ঘোষণা চুক্তির পথে সম্ভাব্য এক বাধা বা ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নেতানিয়াহু তার বিবৃতিতে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে এও যোগ করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি নানা পদক্ষেপ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ইরান যাতে আর কখনো ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক হুমকি হয়ে না উঠতে পারে, সে বিষয়েও তিনি ট্রাম্পকে সমর্থন দেবেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।

নেতানিয়াহুর বিবৃতির শেষ দুই লাইনে বলা হয়েছে, এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ওপর কার্যকর হবে না।

ইসরায়েলের জন্য এই মুহূর্তে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারা দক্ষিণ লেবাননে তাদের অভিযানের গতি বাড়িয়েছে। হিজবুল্লাহর সঙ্গে একটি ‘বাফার জোন’ বা নিরাপদ অঞ্চল তৈরি করতে তারা সেখানে আরও বেশি স্থল সেনা মোতায়েন করছে।

ইসরায়েলের কাছে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের মতোই লেবানন ইস্যুটি সম্ভবত সমান গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি তার চেয়েও বেশি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ একটি ‘আলাদা সংঘর্ষ।’

বুধবার ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় শত শত মানুষকে হত্যা ও আহত করার পর ট্রাম্প পাবলিক ব্রডকাস্টার পিবিএসকে এ কথা বলেন। ট্রাম্প বলেন, ‘হিজবুল্লাহর কারণে তারা এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটাও সমাধান হয়ে যাবে। সব ঠিক আছে।’

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

এদিকে ইরান সতর্ক করে বলেছে যুদ্ধবিরতি থেকে লেবাননকে বাদ দেওয়ায় পুরো অঞ্চলে এই সমঝোতা ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র-সমর্থিত ইরানি সংবাদ ফার্স নিউজ জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে তেহরান কঠোর পদক্ষেপ নেবে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল স্থগিত করা হয়েছে।’

দেশটির ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে যুদ্ধবিরতি থেকে বের হয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, এই যুদ্ধবিরতির আওতায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মিত্ররাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

তবে যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে শতাধিক মানুষ নিহত ও আহত হন। এর পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে কঠোর প্রতিক্রিয়া আসে। লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তির আলোচনা চালিয়ে যাওয়া ‘অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছে ইরান। ইসরায়েলের এই বিধ্বংসী হামলায় কয়েক শ মানুষ নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান এখন পালটা আঘাতের হুমকি দিচ্ছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বুধবার এক বিবৃতিতে বলেন, ইসরায়েল ইতিমধ্যে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও জোরদার করে যুদ্ধবিরতির বেশ কিছু শর্ত লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধের শর্ত দিয়ে চুক্তির অবমাননা করছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। ছবি: রয়টার্স

গালিবাফ বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি বা আলোচনা চালিয়ে যাওয়া অযৌক্তিক।’

ইরানের এক সামরিক কর্মকর্তা ফার্স নিউজকে জানিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলার জবাব দিতে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি নেতা আল জাজিরাকে বলেন, ‘লেবাননে ইসরায়েল যে অপরাধ করেছে, তার শাস্তি দেওয়া হবে।’

এ পরিস্থিতিতে শান্তিপ্রক্রিয়ার শেষটা ভালো হবে কি না, তা কয়েক দিনের মধ্যে বোঝা যাবে বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রস হ্যারিসন। তিনি বলেছেন, দুই সপ্তাহের এই বিরতি কি শুধুই যুদ্ধের একটি কৌশল, নাকি যুদ্ধ বন্ধের সুযোগ তৈরি হলো, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পাল্টাপাল্টি যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, সেগুলো নিয়ে সমঝোতা আসলেই জটিল হবে। লেবাননে হামলা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাই বলা যায়, আগামী দুই সপ্তাহ খুবই কঠিন হতে চলেছে।

 

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর