Tuesday 07 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সরকারের বাড়তি ঋণ বেসরকারি ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি করছে

আদিল খান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৭ এপ্রিল ২০২৬ ২২:২৭

– কোলাজ প্রতীকী ছবি

ঢাকা: সরকার বাজেট ঘাটতি পূরণে চলতি অর্থবছরের অর্ধেক সময় অনেকটা ধীর মনোভাব পোষণ করেছে। কিন্তু রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান মেটাতে সরকার স্বল্পমেয়াদি তারল্য সহায়তার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। আর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঋণ গ্রহণ আগ্রাসী আকার ধারণ করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মাত্র ৯ মাসেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা কার্যত অতিক্রম করেছে, যাকে আগ্রাসী বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ছয় হাজার ৫০ কোটি ৬১ লাখ টাকা নিট ঋণ নিয়েছে, যেখানে সমগ্র অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বাজেট বছরের শেষ প্রান্তিকে পৌঁছানোর আগেই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। আবার মার্চ পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মোট নিট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৯৫৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। গত জুন শেষে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ ৯ মাসে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারের এই বাড়তি ঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে শিল্প, বাণিজ্য ও উৎপাদনমুখী খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংক-ঋণ পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠতে পারে। এতে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে যেতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সারাবাংলাকে জানান, সরকারি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো-রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, ভর্তুকি ও পরিচালন ব্যয়ের চাপ, ব্যাংক একীভূতকরণে সরকারি মূলধন সহায়তা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে অতিরিক্ত ব্যয়। সামগ্রিক খরচ মেটাতে সরকার তিন মাস বাকি সত্ত্বেও লক্ষ্যের চেয়ে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এভাবে আগ্রাসী ভূমিকায় ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ কমে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। গত ২০২৫ সালের জুনে তা ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। সেই হিসাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ বেড়েছে ৩২ হাজার ১৯২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ওভারড্রাফট খাতে ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৬৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা গত জুনে ছিল শূন্য। অন্য দিকে ওয়েজ অ্যান্ড মিনস অ্যাডভান্স খাতে স্থিতি রয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম সারাবাংলাকে জানান, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলোও নিশ্চিত আয় করতে সরকারকে ঋণ দিতে উৎসাহী হয়ে উঠেছে। এতে সরকারের সুদ বাবদ ব্যয় বেড়ে যাবে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে তো সরকার ঋণ নিচ্ছে। ব্যাংকের কাছ থেকে না নিলে তো টাকা ছাপানো লাগবে। সামনের দিনে চাহিদা বাড়লে আগ্রাসী হলেও সরকার ঋণ নিচ্ছে। আর বেসরকারি খাতে ঋণের ব্যাংকগুলো তার চেয়ে বেশি দিতে আগ্রহী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকেও সরকার ঋণ নিয়েছে। ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৮০৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। বিমা কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেও ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করছে সরকার।

বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাজস্ব হিসাব-নিকাশ অনেকটা কাঙ্ক্ষিত না। আবার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে খরচ বাড়াচ্ছি। অন্যদিকে জ্বালানি ও সারের ওপর ভর্তুকি বাড়ছে। কিন্তু রাজস্ব বাড়ছে না। অথচ সরকার বলছে তারা ঋণের ওপর নির্ভরতা কমাতে চায়। এই তিনটির মধ্যে কীভাবে সামঞ্জস্য বিধান করবেন তা উত্তর মেলানো জটিল। এমন পরিস্থিতিতে ব্যয়ের অর্থায়ন যদি ঋণের মাধ্যমেও করা হয়। আয়ের পথ না বাড়িয়ে খরচ বাড়িয়ে চললে দুর্দশা ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু হবে। এই অবস্থা চলতে থাকলে বেসরকারি খাত নতুন বিনিয়োগের জন্য মূলধনের সমস্যা হতে পারে।’

সরকারি নথি বলছে, অন্তর্বর্তী সরকার গত ২ জুন নতুন অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করে। সেখানে সামগ্রিক ঘাটতি দাঁড়ায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা, সেখানে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তার মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু মার্চ পর্যন্ত সময়ে সরকার ১ লাখ ১২ হাজার ৭১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

আদিল খান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর