ঢাকা: বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার জেরে শোকজের মুখে পড়া তিন কর্মকর্তার বদলি আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাতিল করা হয়েছে পূর্বের বদলির নির্দেশ, এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিজ নিজ বিভাগে পুনর্বহাল করা হয়েছে।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
বদলি হওয়া কর্মকর্তারা হলেন, নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, নীল দল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহ এবং একই পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ।
আগের আদেশ অনুযায়ী, নওশাদ মোস্তফাকে প্রধান কার্যালয় থেকে বরিশাল অফিসে, মাসুম বিল্লাহকে রংপুর অফিসে এবং গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া অফিসে বদলি করা হয়েছিল।
জাতীয় নির্বাচনের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই তিন কর্মকর্তা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক কয়েকটি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। সেখানে তারা গভর্নরকে ‘স্বৈরাচার’ বলে উল্লেখ করেন এবং দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ, ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদানসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন।
সংবাদ সম্মেলনের পরদিন তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয় এবং ১০ দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছিল, ব্যাখ্যা পাওয়ার পর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ ছিল, তুলনামূলকভাবে কম দুর্বল এক্সিম ব্যাংক ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংককে পাঁচটি ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ–২০২৫ এর আওতায় ইতোমধ্যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সরকারি মালিকানায় একটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
এ ছাড়া তারা দাবি করেন, বিকাশকে দ্রুত ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্রের দফতর থেকে জানানো হয়, শুধু বিকাশকে লাইসেন্স দেওয়ার জন্য পরিচালনা পর্ষদের সভা আহ্বান করা হয়নি; ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সসহ মোট আটটি এজেন্ডা ওই বৈঠকে ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা সংবাদ সম্মেলন বা প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার আগে গভর্নরের অনুমোদন নিতে বাধ্য। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়ে আপত্তি থাকলে তা অভ্যন্তরীণ ফোরামে উত্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এই বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগেই তাদের শোকজ করা হয় বলে জানা গেছে।
সংবাদ সম্মেলনের দিন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর কয়েকটি গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচনের পর একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। পরিচালনা পর্ষদের আলোচ্য বিষয় প্রকাশ্যে আনা শৃঙ্খলাভঙ্গের শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ বলেন, ব্যাংক খাতে ‘খেয়ালি বক্তব্য’ পরিহার করে বস্তুনিষ্ঠ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক রেজল্যুশন নিশ্চিত করতে হবে। মাসুম বিল্লাহ বলেন, তারা প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন চান, কোনো ব্যক্তির নয়। তার ভাষায়, স্বায়ত্তশাসন মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান একনায়ক বা স্বৈরাচার হয়ে উঠবেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, আগে কথা না বললেও এখন নীরব থাকলে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়তো তারা এতটা খোলামেলা বক্তব্য দিতেন না।
বদলি আদেশ প্রত্যাহারের ফলে আপাতত পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে শোকজের জবাব ও পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু জানানো হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে শৃঙ্খলা ও মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে বিতর্কও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।