ঢাকা: বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অন্যতম ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। সাভারে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে নিজস্ব ক্যাম্পাস। এমনকি সেখানে রয়েছে পাঁচটি আবাসিক হলও। কিন্তু হলগুলো পরিচালনার দায়িত্বে নেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। বরং, বাইরের প্রতিষ্ঠান দিয়ে চালানো হচ্ছে সেগুলো। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীরা হল ও ক্যাম্পাসের একাডেমিক পরিবেশ এবং প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির হলগুলো পরিচালনা করে ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’ নামক এক প্রতিষ্ঠান। কথিত রয়েছে, এটির মালিক ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়েরই ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. সবুর খান। যেখানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হলের ফি বাবদ প্রাপ্ত অর্থ পাওয়ার কথা বিশ্ববিদ্যালয়ের, সেখানে সেই টাকা নিয়ে যাচ্ছে ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ড্যাফোডিলের কোষাগার।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। তাই, বাণিজ্যিক লাভের আশায় হল পরিচালনার জন্য একটি কোম্পানির ব্যানারে অর্থ উপার্জনের এই প্রক্রিয়া অনৈতিক। এটি ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের পরিপন্থী।
সরেজমিনে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটি দুইতলা ভবন ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’কে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাসিক শিক্ষার্থী রয়েছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। এখানে ছেলেদের জন্য তিনটি হল রয়েছে। সেগুলো হলো- ইউনুস খান স্কলার গার্ডেন ১, ২ ও ৩। এ ছাড়া, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে রওশন আরা স্কলার গার্ডেন–১ ও ২ নামে দু’টি হল। এসব হলে আনুমানিক আট হাজার শিক্ষার্থী বসবাস করছেন।
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির হলগুলো নির্মিত হয়েছে ২০২৩ সালের আগে। তবে ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল’ নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা পরিচিত হন ২০২৩ সালে। ট্রেড লাইসেন্স অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. সবুর খানের নামেই রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১০ সালের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি অলাভজনক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। এর হলগুলো পরিচালনার দায়িত্ব কেউ কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে পারে কি না- সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত।
ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির রেজিস্টার ড. নাদির বিন আলি সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছেন যে, ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারনেশনাল’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো পরিচালনা করে। তবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। এ বিষয়ে তিনি ‘ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের’ দায়িত্বে থাকা এম কামালের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান।
এ প্রসেঙ্গে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা এম কামাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো আমরা ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে পরিচালনা করি। এতে আমাদের নিশ্চয়ই বৈধতা রয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের হল ফি বিশ্ববিদ্যালয়কে দেওয়ার কথা থাকলেও সেই টাকা ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের ফান্ডেই দিতে হয়- এমন অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এম কামাল বলেন, ‘এত কিছুতো আমি এখানে বলতে পারব না। আপনি আমার অফিসে আসেন।’
ক্যান্টিন পরিচালনায় অনিয়মের অভিযোগ
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি হলে দুয়েকটি ক্যান্টিন ও দোকান রয়েছে। শিক্ষার্থীদের খাবারে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয় না। অন্যদিকে হলের ক্যান্টিন থেকে প্রতি মাসেই ভাড়া আদায় করছে ক্রিয়েটিভ। এমনকি ক্যান্টিনের চুক্তির সময় ‘সিকিউরিটি মানি’ বাবদ প্রায় ১০ লাখ টাকাও নিয়েছে তারা। ফলে সেই টাকা তুলতে শিক্ষার্থীদের কাছে বেশি দামে খাবার বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী সারাবাংলাকে জানান, হলের খাবারের মান ভালো না। আবার রান্না করে খাওয়ার সুযোগও হল প্রশাসন বন্ধ করে রেখেছে। তাই বেশিরভাগ সময় বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হয়। কিন্তু, রাতে মেয়েদের হলের গেইট বন্ধ হয়ে গেলে খাবার নিয়ে তাদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অনেক সময় রাতে হলের খাবারই অতিরিক্ত দামে কিনে খেতে হয়।
লাভের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবন তৈরি
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরুষ শিক্ষার্থীদের হল ইউনুস খান স্কলার গার্ডেন–১-এর বি ব্লক ভবনটির অনুমোদন ছিল ১২ তলা। তবে ২০২৪ সালে আরও একটি তলা নির্মাণ করা হয়। এতে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনালের আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আয় হলেও সেখানে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের জীবন ঝুঁকির মুখে বলে অভিযোগ উঠেছে।