চট্টগ্রাম ব্যুরো: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে কোনোরকম শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে চট্টগ্রাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

নির্বাচন কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ছবি: সারাবাংলা
নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কা ও পক্ষপাতিত্বের বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে কোনোরকম শঙ্কা নেই- এক লাইনের উত্তর। বরং ভোটাররা ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রের দিকে তাকিয়ে আছেন। অতীতে যে নেতিবাচক নজির ও ইতিহাস ছিল, সামনে তার পুনরাবৃত্তি হবে না—ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে- পক্ষপাতদুষ্টতার কোথাও কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে মনে রাখবেন ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি কমিটি আছে, আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব। যেগুলো রাজনৈতিক বক্তব্য সেগুলোর বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে, আমাদের কমপ্লেইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম আছে, উনারা যথাযথ পদ্ধতিতে অভিযোগ করলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘১৩ ডিসেম্বর থেকে ডেভিল হান্ট ফেইস-টু যেটা শুরু হয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। আমরা এটাকে আরও জোরদার করতে চাচ্ছি। আপনারা জানেন, আমাদের যৌথবাহিনীর অভিযান চলমান আছে। সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন আছে। যৌথবাহিনীর অভিযানকে আমরা আরও গতিশীল করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি, যেটা অতিশীঘ্রই আপনারা দেখতে পাবেন। এই সপ্তাহ থেকেই দেখতে পাবেন, বিশেষ করে ১৫ তারিখের (জানুয়ারি) পর থেকে এটা আরও বেড়ে যাবে। আমরা আশাবাদী যে, সেখানে সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আরও গতিশীলতা আসবে।’

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে চট্টগ্রাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ইসি সানাউল্লাহ। ছবি: সারাবাংলা
সভায় বৃহত্তর চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় যেসব নিরাপত্তা-সংবেদনশীল বিষয় রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে লক্ষ্যে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বার্তা একটাই—স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা। মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হবে। আচরণবিধি প্রতিপালনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ক্ষেত্রে কমিশন কঠোর অবস্থানে থাকবে।’
আচরণবিধি প্রতিপালন নিয়ে প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ধন্যবাদ জানিয়ে নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, ‘দল এবং প্রার্থীদের আচরণবিধি প্রতিপালনে যা যা করা দরকার সেটা করছি। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের ধন্যবাদ দিতে পারি, সার্বিকভাবে দেশের সকল স্থানে তাদের মধ্যে আচরণবিধি প্রতিপালনের বিষয়টি দেখতে পাচ্ছি, যেটা একটা ভালো লক্ষণ। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্ন্তকোন্দলের বিষয়টি কম দেখতে পাচ্ছি। আমরা দেখতে চাই, নির্বাচন যত সামনে আসবে তত যেন কোন্দল না বেড়ে আমরা যেন সত্যিকার অর্থে একটা উৎসবমুখর পরিবেশে আমরা নির্বাচনটা করতে পারি, এটাই জাতির দাবি, সময়ের দাবি। আমরা বিশ্বাস করি, রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা এটা অনুধাবন করেন।’
গুজব-অপতথ্য রোধে গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে তুলে ধরা গণমাধ্যমের বড় দায়িত্ব। অপতথ্য ও গুজব রোধে সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। অপতথ্য ছড়ানো যেমন অপরাধ, তেমনি অপতথ্য শেয়ার করাও অপরাধ—এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
এর আগে, মতবিনিময় সভায় নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ জুলাই অভ্যুত্থানের পর লুট হওয়া পুলিশের অস্ত্র উদ্ধারের তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এক ধরনের গান (অস্ত্র) রানিং হয়। অস্ত্রের একটা সঞ্চালন দেখা দেয়, সন্ত্রাসীদের কদর বেড়ে যায়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনও আনুমানিক ১৫ শতাংশ অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। এগুলো খুঁজে পেতে হবে। শতভাগ খুঁজে পাবেন তা আশা করা যায় না। তবে যারা এগুলো নিয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে বা উদ্ধার করতে পারলে মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়বে। এছাড়া হারিয়ে যাওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি। আনুমানিক ৭০-৭৫ শতাংশ উদ্ধার করা গেছে।বাকিটা এখনও মাঠে আছে। এটাকেও খুঁজে পেতে হবে।’

ছবি: সারাবাংলা
নির্বাচনকে ঘিরে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যেন সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এ এলাকায় (চট্টগ্রাম) সংখ্যালঘুদের আবাস আছে। নির্বাচনকে ঘিরে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল সংখ্যালঘুদের মাঝে বিভিন্ন ঘটনা ঘটানোর প্রয়াস চালাতে পারে। অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।’
নির্বাচনের আগে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্ত বন্ধ রাখা জরুরি উল্লেখ করে সানাউল্লাহ বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ও সীমান্ত অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের একটি অংশ সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে বলে আমাদের ধারণা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক কিছু কর্মকাণ্ড নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। কেউ যদি একটা অস্ত্র সীমান্তের ওপার থেকে এনে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকিয়ে ফেলে সহজে এটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং রোহিঙ্গাদের চলাচলে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে।’
মতবিনিয়ম সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, জেলা পুলিশ সুপার নাজির আহমদ খাঁন।