Sunday 12 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

লাল-সাদায় উৎসবের প্রস্তুতি তুঙ্গে
রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোতে বৈশাখী কেনাকাটার ধুম

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১২ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৬

ঢাকা: বছর ঘুরে বাঙালির দুয়ারে আবারও কড়া নাড়ছে প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। আর মাত্র ৩ দিন পরেই শুরু হবে বাঙালি ঐতিহ্য ধারণের এ উৎসব। নতুন এ বাংলা বছরকে বরণ করে নিতে সর্বত্র তাই সাজ সাজ রব। এই দিনকে সামনে রেখে রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোতে শুরু হয়েছে কেনাকাটার ধুম। শহরের অভিজাত বুটিক হাউস থেকে শুরু করে সাধারণ মার্কেট-সবখানেই এখন ক্রেতাদের ভিড়। সেই ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিক্রেতারা। নতুন বছরকে বরণ করার প্রস্তুতিতে লাল-সাদা রঙের ঐতিহ্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে কমলার নতুন আভা। এতে এনে দিয়েছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়া।

বিক্রেতারা বলছেন, এবার ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট ও হাতের কাজের শাড়ির চাহিদা বেড়েছে। তাতের শাড়িতে পাড় ও আঁচলের বৈচিত্র্য ক্রেতাদের নজর কাড়ছে। ছেলেদের পোশাকেও এসেছে নতুনত্ব। সুতি ও খাদি কাপড়ের পাঞ্জাবিতে জ্যামিতিক ও ফ্লোরাল নকশা ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে।

বিজ্ঞাপন

 

কথা হয় রাজধানীর বুটিক হাউসের এক ব্যবসায়ী আমিনুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, এবার পহেলা বৈশাখের বিক্রি বেশ আগেভাগেই জমে উঠেছে। গত কয়েক বছরের তুলনায় ক্রেতাদের ভিড় অনেক বেশি। আমরা শাড়ির ক্ষেত্রে এবার ব্লক প্রিন্ট, স্ক্রিন প্রিন্ট এবং হাতের কাজের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। লাল-সাদাই মূল ভিত্তি, তবে ক্রেতারা এবার জমকালো কাজের সঙ্গে হালকা কমলার ছোঁয়া আছে এমন শাড়ি বেশি পছন্দ করছেন। বিশেষ করে তাতের শাড়িতে পাড় ও আঁচলের বৈচিত্র্য ক্রেতাদের মন কাড়ছে। কাজের মান এবং নতুনত্বের কারণে আমাদের সংগ্রহ দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে, যা আমাদের জন্য বেশ আশাব্যঞ্জক।

মার্কেট খোলা রাখার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টায় মার্কেট বন্ধ করতে হচ্ছে। পহেলা বৈশাখের আগের দিন পর্যন্ত যদি অন্তত রাত ১০টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি পাওয়া যেত, তবে আমাদের বেচাবিক্রি আরও বাড়ত এবং ক্রেতারাও স্বাচ্ছন্দে কেনাকাটা করতে পারতেন। শেষ মুহূর্তের ভিড় সামলানো আমাদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরেক বিক্রেতা সায়েম আহমেদ জানান, ছেলেদের ফ্যাশনে পাঞ্জাবি সবসময়ই শীর্ষ তালিকায় থাকে। এবার আমরা পাঞ্জাবির কাটে এবং কলারের ডিজাইনে কিছুটা ভিন্নতা এনেছি। সুতি ও খাদি কাপড়ের পাঞ্জাবিতে লাল-সাদার সংমিশ্রণে জ্যামিতিক নকশা এবং ফ্লোরাল মোটিফ এবার বেশ জনপ্রিয়। সায়েম আরও যোগ করেন, তরুণরা এবার একটু শর্ট পাঞ্জাবি বা কটিসহ পাঞ্জাবির দিকে বেশি ঝুঁকছে। কেনাবেচার অবস্থা অত্যন্ত ভালো, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের সমাগম লেগেই আছে। পহেলা বৈশাখের আগে আমাদের স্টকের বড় অংশই বিক্রি হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করছি।

মার্কেটে আসা কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী তানিয়া ইসলাম এবার পোশাকের আরামের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ মানেই প্রচণ্ড গরম, তাই এবার আমি ভারী কোনো পোশাক না কিনে কুর্তা বা ফতুয়া টাইপের কিছু খুঁজছি। লাল-সাদার চিরচেনা রঙে সুতি কাপড়ের একটা কুর্তা কিনেছি যা পরলে আরাম পাওয়া যাবে। বন্ধুদের সঙ্গে দিনভর ঘুরতে হলে আরামদায়ক পোশাকের কোনো বিকল্প নেই। তানিয়ার মতো অনেক তরুণীই এখন শাড়ির বদলে স্টাইলিশ কুর্তা বা কামিজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন যাতে উৎসবের আমেজ এবং আরাম দুটোরই সমন্বয় ঘটে।

তবে উৎসবের দিনে ঐতিহ্যের সঙ্গে আপস করতে নারাজ গৃহিণী মেহজাবীন চৌধুরী। তিনি হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন মনের মতো একটি তাঁতের শাড়ি। তিনি বলেন, বৈশাখ মানেই তো শাড়ি। আমি সবসময়ই এই দিনে দেশি তাঁতের শাড়ি পরতে পছন্দ করি। এবার লাল-সাদা কম্বিনেশনের একটি চমৎকার সুতি শাড়ি দেখছি। গরমের কথা মাথায় রেখে হালকা কাজের শাড়িই আমার প্রথম পছন্দ। সাথে মাটির গহনা আর হাতে রেশমি চুড়ি, এই পূর্ণাঙ্গ সাজ ছাড়া আমার কাছে পহেলা বৈশাখ অসম্পূর্ণ মনে হয়। ছোটবেলা থেকেই এই শাড়ি পড়ার অভ্যাস, তাই বৈশাখী সাজে শাড়িটাই আমার কাছে সেরা।

বন্ধুদের সাথে বৈশাখ উদযাপনের পরিকল্পনা নিয়ে পাঞ্জাবি কিনতে এসেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আরিয়ান খান। তিনি বলেন, প্রতিবছরই বন্ধুদের সাথে রমনার বটমূলে বা টিএসসিতে যাওয়া হয়। তাই এবার এমন একটি পাঞ্জাবি খুঁজছি যা একইসাথে লাল-সাদা রঙের ঐতিহ্যের সাথে মানানসই এবং তরুণদের জন্য ফ্যাশনেবল। পাঞ্জাবির সঙ্গে একটা বৈশাখী উত্তরীয় বা হালকা কাজ করা কটি থাকলে লুকটা বেশ দারুণ হয়। বন্ধুদের সাথে ম্যাচিং করে পাঞ্জাবি পরলে আড্ডার ছবিগুলোও বেশ ভালো আসে। সব মিলিয়ে এবার বাজারে পাঞ্জাবির কালেকশন অনেক সমৃদ্ধ, পছন্দমতো পোশাক বেছে নিতে খুব একটা কষ্ট করতে হচ্ছে না। কিন্তু অফিস বা ক্লাসের ব্যস্ততার পর হাতে খুব কম সময় থাকে। ৭টায় দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাড়াহুড়ো করে সবকিছু কিনতে হচ্ছে, যা বেশ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজধানীর ঢাকারর আড়ং, অঞ্জন’স, কে ক্র্যাফট, দেশজ, বিশ্ব রঙ কিংবা দেশী দশের মতো বড় বুটিক হাউসগুলোর পাশাপাশি গাউসিয়া, নিউ মার্কেট এবং চাঁদনী চকের মতো পাইকারি ও খুচরা বাজারেও এখন ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে মাটির গহনা, রঙিন চুড়ি এবং কাঠের গয়নার দোকানেও ভিড় চোখে পড়ার মতো। সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের কেনাকাটা আর বিক্রেতাদের ব্যস্ততা জানান দিচ্ছে বাঙালির নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই লাল-সাদা উৎসবের রঙ যেন সাধারণ মানুষের ক্লান্তি ধুয়ে মুছে এক নতুন উদ্দীপনার জন্ম দেয়, এখন সেই অপেক্ষাই সবার।

সারাবাংলা/এফএন/এসএস
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর