রাজশাহী: ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ রাজশাহীর পুরাকীর্তি ‘পুঠিয়া রাজবাড়ী’। এটি জাদুঘর হিসেবে ঘোষণার পর থেকে বর্তমানে এখানে হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখরিত থাকছে। রাজবাড়িটি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে ৪ দশমিক ৩১ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৫৫০ সালে সম্রাট আকবরের আমলে পুঠিয়া বংশের গোড়াপত্তন করেন বৎসাচার্যের পুত্র পিতাম্বর। এ বংশের জনৈক নীলাম্বর মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর থেকে (১৬০৫-২৬) রাজা উপাধি লাভ করার পর বাড়িটি ‘পুঠিয়া রাজবাড়ী’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা শেষ হওয়ার পর দীর্ঘদিন অযত্নে-অবহেলায় পড়ে ছিল বাড়িটি, যা ২০২১ সাল থেকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের মাধ্যমে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত একবছরে এই বাড়িটিতে প্রায় ৬০ হাজার পর্যটকের আগমন ঘটেছে। এর মধ্যে ২৪টি দেশের প্রায় দেড় হাজার বিদেশি পর্যটক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে রাজবাড়িটিতে রাজাদের ব্যবহৃত অধিকাংশ সামগ্রীর হদিস না থাকায় ক্ষোভ দেখা গেছে দর্শনার্থীদের মাঝে। এদিকে বাড়িটির চারপাশ ঘিরে শতাধিক অবৈধ স্থাপনা, ফুড কার্ট, গাড়ি পার্কিংসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা না থাকা, মামলা জটিলতা, সংস্কার কাজে পর্যাপ্ত বাজেট না পাওয়াসহ নানাবিধ সংকটে ভুগছে দর্শকনন্দিত স্থানটি। সংশ্লিষ্টরা জানান, সংকট নিরসন করতে পারলে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে রাজাদের স্মৃতি বিজড়িত সমৃদ্ধ এই প্রাসাদটি।
‘পুঠিয়া রাজবাড়ী’র কথা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠা আকর্ষণীয় ইন্দো-ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতিতে তৈরি আয়তাকার দ্বিতল বাড়িটি আসল রাজবাড়ী নয়। এটি ৪০০ বছরের পুরাতন রাজবাড়ীর আদলে ঠিক তার সামনেই ১৮৯৫ সালে তৈরি করা হয়। মহারানী হেমন্ত কুমারী তার শাশুড়ি শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানার্থে এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।
প্রাসাদটি সুদৃশ্য স্তম্ভ, অলংকরণ, কাঠের কাজ, কক্ষের দেয়াল, ফুল ও লতাপাতার সরব উপস্থিত এক নান্দনিক নির্মাণশৈলীর পরিচয় বহন করে। যার অনুপম সৌন্দর্যের ঐশ্বর্য আজও পর্যটকদের বিমোহিত করে চলেছে। রাজবাড়ির ছাদ সমতল, ছাদে লোহার বিম, কাঠের বর্গা ও টালি ব্যবহৃত হয়েছে। আর বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য রাজবাড়ির চারপাশে ওই সময় পরিখা (দিঘি) খনন করা হয়েছিল।
রাজবাড়ীর আশেপাশে ছয় একর আয়তনের শিব সাগর, গোবিন্দ সাগর, শ্যাম সাগর, বেকি দিঘি, মরা দিঘি, লক্ষ্মী সাগর নামক ছয়টি দিঘি খনন করা হয়। রাজবাড়িতে পুঠিয়ার রাজাদের স্মৃতি বিজড়িত বড় গোবিন্দ মন্দির, ছোট গোবিন্দ মন্দির, বড় শিবমন্দির, ছোট শিবমন্দির, বড় আহ্নিক মন্দির, ছোট আহ্নিক মন্দির, জগদ্ধাত্রী মন্দির, দোল মন্দির, রথ মন্দির, গোপাল মন্দির, সালামের মঠ, খিতিশচন্দ্রের মঠ, কেষ্ট খেপার মঠ, হাওয়া খানাসহ ১৫টি প্রাচীন স্থাপনা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের গেজেট আকারে প্রকাশের মাধ্যমে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আর প্রতিটি মন্দিরের দেয়ালেই অপূর্ব সব পোড়ামাটির কারুকাজ।
পোড়ামাটির মাধ্যমে পৌরাণিক কাহিনীর চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। জাদুঘরের তিনটি গ্যালাটিতে রাজাদের ব্যবহৃত লোহার আলমিরা, সিন্দুক, তলোয়ার, খাট, চেয়ার-টেবিলসহ কিছু সামগ্রী রয়েছে। এ ছাড়াও বরেন্দ্র অঞ্চলে পাওয়া বিভিন্ন মূর্তি ও প্রত্ননিদর্শন রাখা হয়েছে সেখানে। পরিত্যক্ত অবস্থায় আরও রয়েছে রানীর স্নানের ঘাট ও অন্দর মহল।
তথ্য মতে, ১৭৪৪ সালে পুঠিয়াদের মধ্যে পারিবারিক কোন্দলের জেরে সম্পত্তি ভাগাভাগি হয়। এতে বড় ছেলে পরেশ নারায়ণ পান সম্পত্তির সাড়ে পাঁচ আনা এবং অন্য তিন ছেলে পান সাড়ে তিন আনা। পাঁচআনির রাজ পরগনার রাজা ছিলেন পরেশ নারায়ণ। তার স্ত্রী ছিলেন মহারানি হেমন্তকুমারী দেবী। রাজার নাম তেমনভাবে কেউ না জানলেও উদার ব্যক্তিত্ব কর্মগুণ ও দানশীলতার জন্য ইতিহাসে আজও ভাস্বর হয়ে আছেন মহারানী হেমন্তকুমারী দেবী। প্রজাবাৎসল ও দানশীল রানি হিসেবে তাই মহারানি হেমন্ত কুমারীর নাম এখনো রয়েছে রাজশাহীর মানুষের মুখে মুখে।
রাজশাহীর প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে গেলেও উঠে আসে তার নাম। রাজশাহীতে ঢোপকল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পানিজনিত মহামারির হাত থেকে এখানকার মানুষকে পরিত্রাণ দিতে তার অবদান আজও কৃতজ্ঞতা ভরে স্মরণ করা হয়। কালের আবর্তে ঐতিহ্যবাহী সেই ঢোপকল আজ বিলুপ্ত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার নাম থেকে গেছে।
রাজপ্রথা বিলুপ্তের পর চারআনি রাজপ্রাসাদটি এক প্রকার পরিত্যক্ত বাড়ি হিসেবেই পড়ে রয়েছে। আর পুঠিয়া রাজবাড়ির বেশিরভাগ স্থাপনাই রয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের অধীনে। এগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার করে। তবে মামলা জটিলতার কারণে চারআনি এস্টেটের রাজপ্রাসাদটি এখন পর্যন্ত প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর নিতে পারেনি। তাই অযত্নেও অবহেলায় এই রাজবাড়িটির ধ্বংসাবশেষটুকুই রয়েছে।
রাজবাড়িটি দেখতে আসা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সারাবাংলাকে বলেন, ‘দর্শনীয় স্থান হিসেবে বরাবরই পুঠিয়া রাজবাড়ী আমার পছন্দের একটি জায়গা। বাংলাদেশের পুরাতন ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরার জন্য এরকম জায়গার কোনো বিকল্প হয় না। তৎকালীন সময়ে সুনিপনণ এবং দক্ষ হাতে তৈরি স্থাপত্য এবং কারুকার্যের শোভা অতুলনীয়। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ছাড়াই এত নিঁখুত স্থাপত্যশৈলী এবং রাজা-রাণীদের রুচিশীলতা বিমোহিত হওয়ার মতো। এখানে অসংখ্য নান্দনিকতায় ভরা মন্দির দেখলাম, যা শৌখিনতার পাশাপাশি গভীর ধর্মীয় প্রেমের বহিঃপ্রকাশ। সরকারকে অনুরোধ করব, আমাদের এই সমৃদ্ধ ইতিহাস সঠিকভাবে দেখভালের ব্যবস্থা এবং নতুন করে যা কিছু সংযুক্তি প্রয়োজন, সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিবেন।’
দর্শনার্থী মঞ্জুশ্রী রায় পুঠিয়া জাদুঘর মনুমেন্টে সম্পর্কে সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাজবাড়িটির কথা অনেক শুনেছি, তাই না এসে পারলাম না। আসার পর যতটুকু শুনেছিলাম তার থেকেও অনেক বেশি ভালো লেগেছে। অবাক হচ্ছি এতবছর আগেও হাতের ছোঁয়াতে এত চমৎকারভাবে কাজ করা হয়েছে। আমি এখানে এসে খুবই খুশি। আমি বলব এই জায়গাগুলো যেন নষ্ট না হয়। আমাদের এবং পরবর্তী জেনারেশন এগুলো দেখবে, সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানবে।’
আরেক দর্শনার্থী উচ্ছ্বাস এবং আক্ষেপ প্রকাশ করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি আজ প্রথমবারের মতো এখানে এসেছি। এত সুন্দর নিঁখুত কারুকার্য বিমোহিত করেছে। তবে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ভেবেছিলাম রাজবাড়িতে যাচ্ছি মানেই রাজাদের জীবনজগৎ সম্পর্কে জানতে পারব। তাদের ব্যবহার্য তৈসজ সামগ্রী দেখতে পাব, কিন্তু হতাশ হলাম। সামান্য দুয়েকটা জিনিস ছাড়া কিছুই নেই। জাদুঘরের কক্ষ জুড়ে রাজবাড়ির এবং দেশের বিভিন্ন স্থাপনার ছবি। লোহার সিন্দুক, লোহার আলমিরা নজরে পড়েছে। আরও খাট, চেয়ারসহ দুয়েকটা জিনিস আছে শুনলাম। কিন্তু সে রুমগুলো আজ বন্ধ থাকায় দেখতে পারিনি। আমার কাছে এগুলো অতি সামান্য মনে হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ করব রাজাদের ব্যবহার্য সামগ্রী উদ্ধার করে জাদুঘরে সংযুক্ত করুন।’
বড় গোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত সারাবাংলাকে বলেন, ‘সারাবছরে ধুমধাম করে বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব পালিত হয় এখানে। বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্য দিয়ে আয়োজনে নাম যজ্ঞ, দোল পূজা, বাসন্তী পূজাসহ সব অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। হাজার হাজার ভক্ত আসে।’ যতক্ষণ ভক্ত থাকেন ততক্ষণ, ভোজের আয়োজন হয় বলেও জানান তিনি।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর পুঠিয়া জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান হাফিজুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর ২০১৫ সালে পুঠিয়া রাজবাড়ীর দায়িত্ব গ্রহণ করে। তার আগে কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হত। ২০২১ সালে সংস্কার করে টিকিটের মাধ্যমে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।’
হাফিজুর বলেন, ‘সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ কোটি টাকার বাজেট এসেছে, যা দিয়ে সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। সংস্কার কাজে সিমেন্ট, সাধারণ রড, সাধারণ মিস্ত্রির পরিবর্তে চুন-শুরকি, বিশেষ ধরণের লোহা এবং দক্ষ মিস্ত্রি প্রয়োজন পড়ছে, যা ব্যয়বহুল। তাই এই অল্প বাজেটের মাধ্যমে বিশাল পরিসরে কাজ করা সম্ভব নয়। ফলে প্রয়োজন বড় বাজেট। বাজেটের জন্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে।’ এই বাজেট পেলেই দ্রুত কাজ করতে পারবেন বলেও জানান তিনি।
বর্তমানে রাজবাড়ির সামনে, পেছনে, রাস্তার ধারে প্রায় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা রয়েছে, যা রাজবাড়ীর আসল সৌন্দর্য নষ্ট করছে। তবে এগুলো উঠানো একার পক্ষে সম্ভন না। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রণালয় সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন এই কাস্টোডিয়ান।
রাজাদের ব্যবহার্য জিনিস নেই কেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘শুধু পুঠিায়ার উদ্ভব থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত প্রায় ৪০০ বছরের হিন্দুদের ইতিহাস ঐতিহ্যের নিদর্শন এখানে থাকার কথা ছিল। কিন্তু জমিদারি প্রথা শেষ হওয়ার পর থেকেই সামগ্রীগুলো বেহাত হতে শুরু করে। ’৭১-এর পরে আরেকদফায় লণ্ডভণ্ড হয়। এরপর দীর্ঘদিন বাড়িটি কলেজ হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। ফলে ততদিনে জিনিসগুলো বেহাত হয়ে যায়। তার পরও আমরা কিছু সামগ্রী উদ্ধার করতে সামর্থ হয়েছি। তলোয়ার, খাট, চেয়ার-টেবিল, সিন্দুক, আলমিরা আমরা সংযুক্ত করে গ্যালারিগুলো উন্মুক্ত করেছি। আরও যা যা সম্ভব উদ্ধারের প্রচেষ্টা আমরা চালাব।’
রাজবাড়িটিকে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘বাড়িটি তৎকালীন ভারতবর্ষে ১৩ হাজার বর্গ মাইলের অর্থাৎ উত্তরবঙ্গের রাজধানী ছিল। স্থাপত্য শৈলীতে অন্যন্য এই রাজবাড়িকে কেন্দ্র করে মাস্টাপ্ল্যান, প্রকল্প এবং সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকলে দেশের মধ্যে অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।’
চার আনি জমিদার বাড়ির মামলা চলমান রয়েছে। সেটা নিষ্পত্তি করতে চেষ্টা চালাচ্ছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতর। নিষ্পত্তি হলে সেটাও জাদুঘরের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সংস্কার কাজ করা যাবে বলেও জানান হাফিজুর রহমান।