কক্সবাজার: পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) ছাড়াই মহেশখালী চ্যানেল ও উপকূল থেকে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পরিবেশবাদী মহলে। এ অনুমতি বাতিলের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছে তিনটি সংগঠন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২ এপ্রিল কক্সবাজার জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের সই করা চিঠিতে ‘টোকিও-এমআইএল-জেভি’ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়। এতে প্রতি ঘনফুট বালুর মূল্য ধরা হয়েছে ৬ টাকা ৯৪ পয়সা।
অনুমতিপত্রে বলা হয়, মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের (সওজ অংশ) অধীনে ‘মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড’ নির্মাণের জন্য মহেশখালীর হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা মৌজা থেকে এই বালু উত্তোলন করা হবে। বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি ১২ অনুসরণ এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে, অনুমতিপত্রে ১৩টি শর্ত থাকলেও বাস্তবতার সঙ্গে সেগুলোর কিছু অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক সরকারি কর্মকর্তা। শর্ত অনুযায়ী, ৫ কিলোমিটারের বেশি এলাকায় বালু উত্তোলন ‘লাল’ শ্রেণিভুক্ত হওয়ায় পরিবেশ অধিদফতরের মাধ্যমে ইআইএ সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এ প্রকল্পে তা করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিবেশ অধিদফতরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাতারবাড়ী প্রকল্পের জন্য পূর্বে যে ইআইএ করা হয়েছে, সেখানে বালু কোথা থেকে ও কী পরিমাণ তোলা হবে তার কোনো উল্লেখ নেই। ফলে নতুন করে ইআইএ অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতর কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ইআইএ ছাড়া মহেশখালীর হামিদারদিয়া ও ঠাকুরতলা এলাকা থেকে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। তা করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে, বালু উত্তোলনের অনুমতি বাতিলের দাবিতে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) স্মারকলিপি দিয়েছে ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস), কক্সবাজার সিভিল সোসাইটি ও নদী পরিব্রাজক দল। জেলা প্রশাসকের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ইমরান হোসাইন সজীব স্মারকলিপি গ্রহণ করেন।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী ইআইএ ছাড়া এ ধরনের বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া আইনসম্মত নয়। তাছাড়া, প্রকল্পটির জন্য তিনটি প্যাকেজে ৫০ কোটির বেশি ঘনফুট বালুর প্রয়োজন হলেও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সেই তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।
সংগঠনগুলোর নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, ইআইএ ছাড়া নির্বিচারে বালু উত্তোলন করলে নদীভাঙন বাড়বে, জলপ্রবাহ ব্যাহত হবে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকা ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। এমনকি কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত রানওয়েও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের (এমআইএল) স্থানীয় কর্মকর্তা ইখতিয়ার দাবি করেন, প্রকল্পটির জন্য ইআইএ ও পরিবেশ ছাড়পত্র রয়েছে। তবে তিনি লিখিত অনুমতিপত্র এখনও হাতে পাননি বলে জানান।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) কক্সবাজারের পোর্ট অফিসার মো. আব্দুল ওয়াকিল নিশ্চিত করেন, ৩১ মার্চের সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেছেন, ‘পরিবেশের ক্ষতি করে বালু তোলার সুযোগ নেই।’
এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া, কক্সবাজারের অন্যান্য পরিবেশবাদীরাও দ্রুত এ অনুমোদন বাতিল করে আইন মেনে নতুন করে ইআইএ সম্পন্নের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।