রংপুর: রংপুর বিভাগের বোরো ধানের মাঠ এখন শুকনো মরুভূমির মতো। ডিজেলের তীব্র সংকটে ট্রাক্টর ও সেচ পাম্পগুলো নীরব। কৃষকেরা দিনরাত ছুটছেন পাম্প থেকে পাম্পে, কিন্তু তেল না পেয়ে খালি হাতে ফিরছেন। কৃষকরা বলছেন, বোরো ধানের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পানির অভাবে সবুজ খেত হলুদ হয়ে যাচ্ছে—যা শুধু ফসলের ক্ষতি নয়, হাজার হাজার কৃষক পরিবারের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে শুকিয়ে দিচ্ছে। তবে বিভাগীয় প্রশাসন বলছে, কৃষকদের সহজে ডিজেল পাওয়ার জন্য চেষ্টা চলছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী জেলায় বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫ লাখ ৯ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশ জমি ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ ও পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পাম্প মালিক ও কৃষকদের অভিযোগ, ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেল নেই বললেই চলে। যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে, তা সীমিত পরিমাণে এবং খোলা বাজারে দাম উঠেছে ১২০ থেকে ২২০-২৫০ টাকা লিটার পর্যন্ত। সরকারি দাম ১০২ টাকার আশেপাশে থাকলেও বাস্তবে কৃষকদের গুনতে হচ্ছে অনেক বেশি।
রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, অনেক খেতে পানি নেই। কৃষক রাজু ইসলাম বলেন, “খরচ তো আগেই অনেক বেশি ছিল। এখন ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেচ দিতেই হিমশিম খাচ্ছি। ধান গাছগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, চোখের সামনে সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা কী খেয়ে বাঁচবো?”

মিঠাপুকুরের বলদিপুকুর গ্রামের সোহাগ মিয়া কয়েকটি পাম্প ঘুরে হতাশ হয়ে খোলা বাজার থেকে ২২০ টাকা লিটারে ডিজেল কিনেছেন। রানীপুকুর এলাকার জসিম উদ্দিনর বলেন, “শুক্রবার সারাদিন বাজার চষে এক লিটারও পাইনি। আমার বোরো খেত শুকিয়ে যাচ্ছে। ২৫০ টাকা দিতেও রাজি, কিন্তু তেলই নেই।”
সেচ পাম্প অপারেটররা বলছেন, ডিজেল না পেলে পাম্প চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেকে বাধ্য হয়ে সেচের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছেন, যা কৃষকদের ঋণের বোঝা আরও ভারী করছে। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুসারে, বিভাগে ২১,৫৩৫টি গভীর নলকূপের মধ্যে ৬১৫টি এবং ২,১০,৪৪৯টি অগভীর নলকূপের মধ্যে ৯৮,২৬৮টি ডিজেলচালিত। এছাড়া ১৭,৬৪৭টি লো-লিফট পাম্পের মধ্যে ১১,৪৫৮টি ডিজেলনির্ভর।
কৃষি অর্থনীতিবিদ রায়ান আহমেদ রাজু বলেন, “বোরো ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য। এর ৬২-৬৫ শতাংশ ক্ষেত ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভর করে। এই মুহূর্তে কৃষি খাতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত না করলে ফলন অর্ধেক নেমে যেতে পারে। কৃষকরা পথে বসবে।”
কৃষক ও শ্রমিক সমিতির নেতা আইনজীবী পলাশ কান্তি নাগ সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, “বোরো চাষের এই সময়ে পানি না দিলে ফলন অর্ধেক হয়ে যাবে। সরকার কৃষকের পাশে দাঁড়াক। না হলে পরিবারগুলোর সংসার ভেঙে পড়বে।”
তবে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার শহিদুল ইসলাম বলছেন, কৃষকদের সহজে ডিজেল পাওয়ার জন্য চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “সরকার মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। তবে মাঠপর্যায়ে সংকট অব্যাহত।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ রায়ান আহমেদ রাজু বলেন, “রংপুর বিভাগের এই হৃদয়বিদারক সংকট শুধু একটি ফসলের নয়—লাখ লাখ কৃষক পরিবারের জীবিকা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্ন। দ্রুত ডিজেল সরবরাহ বাড়ানো, সিন্ডিকেট রোধ করা এবং কৃষকদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ না দিলে বোরো মৌসুমের স্বপ্ন শুকনো মাটির সঙ্গে মিশে যাবে।”