Friday 03 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জ্বালানি সংকট
ডিজেলের দাম বেশি, ভাড়া না বাড়ায় লোকসানে ইঞ্জিন চালিত নৌকার মাঝিরা

রানা আহমেদ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:২৭ | আপডেট: ৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৩৪

ঘাটে নোঙর করা নৌকা।

সিরাজগঞ্জ: দেশে জ্বালানী সংকটের কারণে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ডিজেল কিনে সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীতে চলাচল করছে ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকা। বেশি দাম দিয়ে ডিজেল কিনলেও ভাড়া না বাড়ায় লোকসানের মুখে পড়েছেন নৌকার মাঝিরা। চরবাসীদের সঙ্গে জেলা শহরের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যমই হচ্ছে নৌ পথ। সড়ক পথ না থাকায় সারা বছরই নৌ পথ দিয়ে চলাচল করতে হয় চর অঞ্চলের মানুষদের। এতে ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকাই তাদের একমাত্র ভরসা।
কিন্তু জ্বালানী তেল (ডিজেল) এর তীব্র সংকটে যমুনা নদীতে ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকা চলাচলে বর্তমানে খরচ বেড়ে যাওয়ায় নৌকার মাঝিরা পড়েছেন লোকসানে মুখে। লোকসানের মুখে পড়ে অনেক মাঝিই এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বলে জানা গেছে। এভাবে আর কিছুদিন চললে যমুনা নদীতে ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মাঝিরা।
সরেজমিনে যমুনা নদীর নৌকা ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, নদীরপাড়ে সারি সারি ভাবে ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকাগুলো নোঙর করে রেখে বসে আছেন মাঝিরা। জ্বালানী তেল ডিজেল সংকটে গত কয়েকদিন ধরে যমুনা নদীতে কমে এসেছে ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকা চলাচল। ভাড়া না বাড়ায় বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে দেখে অনেক মাঝিই যাত্রী পারাপার বন্ধ করে দিয়েছেন। এতে দুর্ভোগেও পড়তে হচ্ছে চর অঞ্চলের মানুষদের। এতে একদিকে যেমন চর অঞ্চলের মানুষদের সঙ্গে জেলা শহরের যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন অনেক‌ মাঝিই।
সিরাজগঞ্জ পুরাতন জেলখানা ঘাটে কথা হয় দেলোয়ার মাঝির সাথে। তিনি বলেন, দেশে জ্বালানী তেলের সংকটের কারণে আমাদের এখন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ডিজেল কিনে হচ্ছে। নৌকার ভাড়া না বাড়ায় এই ঘাটের কয়েকটি নৌকা বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে। অল্প কিছু যাত্রীবাহী নৌকা চলাচল করছে কিন্তু সেইসব মাঝিরা চরে থেকে বেশি দামে তেল সংগ্রহ করে যাত্রী পারাপার করছে তবে ভাড়া না বাড়ায় তারা এখন লোকসানে মুখে পড়েছেন। তিনি আরও বলেন, আমাদের সব মাঝির পক্ষে বেশি দাম দিয়ে তেল কেনা সম্ভব না। সরকারের কাছে অনুরোধ আমাদের জন্য আগের দামে দিনে যদি কয়েক লিটার তেলের ব্যবস্থা করে দিত তাহলে আমরা মাঝিরা খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকতে পারতাম।
কাজিপুর উপজেলার তেকানী ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মাসুদ রানা বলেন, আমাদের কাজিপুরের বেশিরভাগ ইউনিয়নই চর অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত আমাদের উপজেলা এবং জেলা শহরে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু দেশে জ্বালানী তেলের সংকটের কারণে এখানকার নৌকার মাঝিদের ব্যাপক সমস্যা হচ্ছে। যেমন আমার ছেলে মেয়ে সিরাজগঞ্জ শহরে লেখাপড়া করায় আমার ফ্যামিলিকে নিয়ে শহরে বসবাস করি। বাবা-মাকে নিয়ে আমি চরে বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করি। সপ্তাহে কয়েকবার শহর এবং চরে যাতায়াত করতে হয়। আমাদের এই চর থেকে জেলা শহরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যমই হচ্ছে নৌ পথ। আগে তেকানীর ঘাট থেকে প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় শহরে যাওয়ার জন্য নৌকা পাওয়া যেত। কিছুদিন হলো জ্বালানী তেল সংকটের কারণে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে মাঝিরা তেল সংগ্রহ করে যাত্রীদের পারাপার করলেও কমে এসেছে ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকা সংখ্যা। এতে ইচ্ছে করলেও আগের মতো যখন তখন শহরে যেতে পারছি না।
তেকানী নৌকা ঘাটে মাঝি বেল্লাল হোসেন বলেন, তেকানী নৌকা ঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে সিরাজগঞ্জের মতিন সাহেবের ঘাট থেকে ঘুরে আসতে প্রায় ২৩-২৪ লিটার তেল লাগে। এতে আমাদের আগে খরচ হতো ২৫০০ টাকা মতো। আগে আমাদের চরে থেকেই প্রতি লিটার তেল (ডিজেল) কিনতাম ১০২ থেকে ১০৩ টাকা করে। কিন্তু এখন তেলের তীব্র সংকটের কারণে নাটুয়াপাড়া চরে থেকে তেল কিনতে হচ্ছে তাও আবার বেশি দামে। এখন প্রতি লিটার তেল (ডিজেল) কিনতে হচ্ছে ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা করে। এখন সিরাজগঞ্জ ঘাট থেকে ঘুরে আসলে খরচ হচ্ছে ৩ হাজার টাকার উপরে। আমাদের এখন শুধু খরচটাই উঠছে অনেক সময় তাও হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, তেকানী নৌকা ঘাট থেকে বিভিন্ন ঘাটে প্রায় ৭২টা ইঞ্জিন চালিত শ্যালো নৌকা চলাচল করে। কিন্তু তেলের তীব্র সংকটের কারণে অনেক নৌকা এখন বন্ধ রয়েছে। বন্ধ থাকা নৌকার মাঝিরা এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বলে জানান তিনি।
এদিকে চৌহালী উপজেলা অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন এই উপজেলা থেকে অগণিত মানুষ জেলা শহরে যাতায়াত করে। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরাঞ্চলের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী প্রতিদিন যমুনা নদী হয়ে লেখাপড়া করতে স্কুলে যায়। কিন্তু কিছু দিন হলো নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলাচল কমে এসেছে এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।
চৌহালী উপজেলা থেকে এনায়েতপুর নৌকা ঘাটে যাত্রী নিয়ে আসা সাগর মাঝির সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আমাদের চরে খুচরা দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। যাত্রীদের কাছ থেকে ৫-১০ টাকা বেশি ভাড়া চাইলে তারা দিতে চায় না। আমাদের লোকসান হলেও কিছু করার নাই কারণ আমাদের পেশাই নদীতে নৌকা নিয়ে যাত্রী পারাপার করা। ইচ্ছে করলেও তো পেশা বদলাতে পারবো না। তিনি বলেন, আমরা মাঝিরা ঘাটের ইজারাদারকে বলেছি যাত্রী পারাপারে কয়েক টাকা করে ভাড়া বাড়াতে কিন্তু ইজারাদার বলেছেন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সব নাকি ঠিক হয়ে যাবে তাই এই কয়েকদিনের জন্য ভাড়া বাড়ানো ঠিক হবে না।
এনায়েতপুর নৌকা ঘাটের ইজারাদার ইউসুফ আলী জানান, জ্বালানী তেলের সংকট থাকলেও নদীতে এখন ইঞ্জিন চালিত নৌকা চলাচলে সমস্যা হচ্ছে না। তবে অনেক মাঝিই বেশি দাম দিয়ে তেল কিনে নৌকা চালাতে চাচ্ছে না। এই ঘাট থেকে বেশকিছু নৌকা চলাচল করলেও সেসব নৌকার মাঝিরা বেশি দামে বিভিন্নভাবে তেল সংগ্রহ করে চালাচ্ছে। সরকার থেকে তো তেলের দাম বৃদ্ধি করেননি। যাদের থেকে মাঝিরা তেল সংগ্রহ করছে তারা নাকি বেশি দামেই তেল কিনেছেন। সরকার যেমন মোটরসাইকেলে তেল দিতে কার্ডের ব্যবস্থা করেছে আমাদের মাঝিদের জন্যেও যদি এইরকম ব্যবস্থা করত তাহলে মাঝিদের বেশি দামে তেল কিনতে হতো না।
সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, তেলের দাম বাড়েনি। বাঘাবাড়ি বন্দর থেকে সব জায়গায় তেল সরবারহ করা হচ্ছে। দাম বেশি নেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে দাম বেশি নিয়ে থাকলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরো

রানা আহমেদ - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর