রংপুর: ঐতিহ্যবাহী ধান, আলু ও সবজির অঞ্চল রংপুর এখন ধীরে ধীরে স্ট্রবেরি চাষের নতুন সম্ভাবনার কেন্দ্র হয়ে উঠছে। মাত্র পাঁচ বছর আগে যেখানে এ ফলের চাষ ছিল ৬ হেক্টর জমিতে, সেখানে চলতি মৌসুমে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও নীলফামারী জেলায় মোট ৪৭ হেক্টর জমিতে স্ট্রবেরি চাষ হয়েছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ৪৫ হেক্টর।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, রংপুর অঞ্চলের দীর্ঘ শীতকাল, উর্বর মাটি ও তুলনামূলক শুষ্ক আবহাওয়া স্ট্রবেরি চাষের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক নতুন কৃষিপণ্য হিসেবে সুযোগ তৈরি করছে।
রংপুর সদর উপজেলার কৃষক হাসান জাহিদ ২০১৭ সালে শখের বশে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ৪ বিঘা জমিতে চাষ করছেন। তিনি বলেন, ‘প্রতি বছর খরচ বাদ দিয়ে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আয় হয়। এতে কয়েকজন শ্রমিকের কর্মসংস্থানও হয়েছে। তার খামারে পরিষ্কার সারি করে লাগানো গাছগুলো মালচিং পলিথিন দিয়ে ঢাকা, যা আগাছা কমায়, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে এবং ফল পরিষ্কার রাখে।’

অন্যদিকে পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রাজু আহমেদ ২০২২ সালে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করে এখন ১২ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে স্ট্রবেরি চাষ করছেন। নিজস্ব চারা উৎপাদনের মাধ্যমে তিনি খরচ কমিয়ে এনেছেন। তিনি জানান, ‘স্ট্রবেরির চাহিদা খুব ভালো। পাইকাররা সরাসরি মাঠে এসে কিনে নিয়ে যায়, তবে আমরা বাজার মূল্যের প্রায় অর্ধেক দাম পাই।’
চাষ পদ্ধতি ও লাভের হিসাব
কৃষি বিভাগ জানায়, ১০ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় স্ট্রবেরি ভালো জন্মে। সাধারণত অক্টোবর-নভেম্বরে চারা রোপণ করা হয় এবং ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়।
উদ্যোক্তা রাজু আহমেদ জানান, প্রতি বিঘায় চাষের খরচ প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। হেক্টরপ্রতি ফলন হয় ৬ থেকে ১০ টন। বাজারে খুচরা দাম কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত হলেও কৃষকরা পাইকারি বাজারে তুলনামূলক কম দাম পান। তবুও সঠিক উৎপাদন হলে প্রতি বিঘায় ২ থেকে ৩ লাখ টাকা লাভ সম্ভব।

বাজারে চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
রংপুর সিটি বাজারের ফল পাইকার খোয়ামুদ্দিন বেপারি বলেন, ‘স্ট্রবেরি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, ফলে সংরক্ষণ ও পরিবহন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে রংপুরের উৎপাদিত স্ট্রবেরি এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রংপুরের মাটিতে স্ট্রবেরি একটি নতুন সম্ভাবনাময় ফসল হয়ে উঠছে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা আধুনিক মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে সফলতার গল্প তৈরি করছেন।’
তিনি বলেন, “কৃষি বিভাগ কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং প্রযুক্তিগত পরামর্শ প্রদান করছে।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সূত্র জানায়, জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশে স্ট্রবেরি চাষ দ্রুত বাড়ছে—দুই বছরে উৎপাদন ২১০ টন থেকে ৪৩৫ টনে দ্বিগুণ হয়েছে। রংপুরের পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুরসহ অন্যান্য এলাকায়ও এর সম্প্রসারণ ঘটছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত চারা, আধুনিক চাষ পদ্ধতি ও ভালো বাজার সংযোগ বাড়ানো গেলে রংপুরের কৃষি অর্থনীতিতে স্ট্রবেরি একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।