কক্সবাজার: নদীর পাড় ও ফসলি জমি থেকে মাটি কাটায় নিষেধাজ্ঞা কার্যত অচল কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের ভান্ডারির ডেপার ছড়া খালে। দিন-রাত এক করে অন্তত ৩০টি শ্যালো মেশিনের গর্জনে কেঁপে উঠছে গ্রাম। আর ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন হাজারো পরিবার।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ডেপার ছড়া খালের দুই তীর ঘেঁষে একের পর এক গ্রাম এখন হুমকির মুখে। অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে ফসলি জমি, মসজিদ-মাদরাসা, সড়ক ও সেতুসহ শত শত ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী নাছির উদ্দিন ওরফে নাজিম উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র পাহারায় অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করে আসছেন। এতে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনজীবন চরম দুর্ভোগে পড়েছে।
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডেপার ছড়া খাল ও আশপাশের ফসলি জমিতে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। মেশিনের বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে আশপাশের গ্রাম। বালু উত্তোলনের কারণে খালের পাড় ভেঙে পড়ছে, হুমকির মুখে পড়েছে ফসলি জমি, বসতঘর, মসজিদ-মাদরাসা ও সেতু। এরই মধ্যে কয়েকটি গ্রামীণ সড়ক ধসে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা বলেন, ‘দিনে রোজা রেখে সন্ধ্যায় ইফতার ও তারাবির নামাজ শেষে একটু বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সারারাত ট্রাক চলাচল আর শ্যালো মেশিনের শব্দে ঘুমানো যায় না। বাতাসে উড়তে থাকা বালুর ধুলোয় শিশু ও বয়স্করা শ্বাসকষ্টে ভুগছে।’ তাদের দাবি, একাধিকবার প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, নাছির উদ্দিন সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে লাখ লাখ ঘনফুট মাটি কেটে বিক্রি করেছেন। এভাবে তিনি অর্ধকোটি টাকারও বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন। পাহাড় কেটে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগও তোলেন তারা। বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে নাজিম উদ্দিন ও তার ভাই শাহাব উদ্দিন সশস্ত্র পাহারা দেন বলেও দাবি করেন এলাকাবাসী। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
এদিকে গত রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে অবৈধ বালু উত্তোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন তিন সাংবাদিক। তারা হলেন, কালের কণ্ঠ পত্রিকার চকরিয়া প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ, আমার দেশ পত্রিকার ইকবাল ফারুক ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকার জিয়াবুল হক।
সাংবাদিকেরা জানান, তারা সরেজমিনে বালু উত্তোলনের ভিডিও ও ছবি ধারণ করছিলেন। এ সময় শ্রমিকেরা চিৎকার শুরু করলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন নাজিম উদ্দিন। সাংবাদিকদের ‘মাটিতে পুঁতে ফেলতে’ নির্দেশ দেন তিনি। এরপর তাদের মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে ছড়ার পানিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং এলোপাতাড়ি মারধর করা হয়। ছোটন কান্তি নাথ ও জিয়াবুল হককে মারতে মারতে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এতে ছোটনের মাথা ফেটে যায় এবং জিয়াবুলের ডান হাতের হাড় ভেঙে যায়। ইকবাল ফারুকের ডান হাতের তালু কেটে যায় ধারালো অস্ত্রের কোপে।
তারা আরও জানান, এ ঘটনায় নাজিম উদ্দিনকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে চকরিয়া থানায় মামলা হয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় স্থানীয় কর্মরত সাংবাদিকেরা নিন্দা জানিয়ে দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় যুবক মো. মিজান বলেন, সব মিলিয়ে হারবাং এখন আতঙ্কের জনপদ। প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ না এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, নিষেধাজ্ঞার পরও কীভাবে প্রকাশ্যে দিনরাত বালু উত্তোলন চলছে? শ্যালো মেশিনের গর্জনে কেঁপে ওঠা জনপদের আর্তনাদ প্রশাসনের কানে কেন পৌঁছায় না?
পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে খাল ও নদী থেকে বালু উত্তোলন করলে ভাঙন, জলাবদ্ধতা ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের ঝুঁকি বাড়ে। ফসলি জমি ও বসতভিটার স্থায়িত্বও হুমকির মুখে পড়ে। হারবাংয়ের ডেপার ছড়া খালের বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই স্পষ্ট করছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্থানীয় প্রভাবশালী অভিযুক্ত নাজিম উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। সাংবাদিক মারধরের পর বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। বালু উত্তোলন বন্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে পুলিশ সহযোগিতা করবে।’
চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারী যেই হোক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’