Tuesday 24 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বাম্পার ফলন প্রত্যাশা
মুকুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা আমের রাজধানী

মো. আশরাফুল ইসলাম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৪

গাছে গাছে শোভা পাচ্ছে আমের মুকুল। ছবি: সারাবাংলা

চাঁপাইনবাবগঞ্জ: ‘আমের রাজধানী’খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসন্তের আগমনে আমবাগানগুলো হলুদ মুকুলে সেজে উঠতে শুরু করেছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ আমগাছে এরই মধ্যে মুকুল দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা, চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত আবহাওয়া এমন থাকলে প্রায় প্রতিটি গাছ মুকুলে ছেয়ে যাবে ।

শীতের বিদায় আর বসন্তের শুরুতে তাপমাত্রার সঠিক ভারসাম্য ও আর্দ্রতার অনুকূল সমন্বয়ের কারণে এবার মুকুল আসার হার অত্যন্ত সন্তোষজনক। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, মৌসুমের শুরুতেই এমন ইতিবাচক চিত্র বড়ধরনের ফলনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে চূড়ান্ত ফলন অনেকটা নির্ভর করবে আসন্ন দিনগুলোতে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও কালবৈশাখী ঝড়ের ওপর।

বিজ্ঞাপন

জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম। এখানে ফজলি, খিরসাপাত, গোপালভোগ, ল্যাংড়াসহ দেড় শতাধিক জাতের সুস্বাদু আম উৎপাদিত হয়। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রফতানি হয় এ অঞ্চলের আম। বিশেষ করে মৌসুমে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ব্যাপক চাহিদা থাকে, ফলে জেলার অর্থনীতিতে আমের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গতবছর ফলন ভালো হলেও পাকার মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক আম নষ্ট হয়ে যায়। এতে দাম কমে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েন চাষিরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেককেই লোকসান গুনতে হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার মৌসুমের শুরু থেকেই বাগান পরিচর্যায় বাড়তি মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, সুষম সার প্রয়োগ ও রোগ-পোকার আক্রমণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহার করছেন চাষিরা।

তবে এ বছর পরিচর্যার খরচ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বাগান মালিকরা। সার, কীটনাশক ও শ্রমিক মজুরির দাম আগের তুলনায় বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। চাষিদের দাবি, প্রণোদনা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারি সহায়তা বাড়ানো হলে তারা আরও উৎসাহ নিয়ে উৎপাদনে মন দিতে পারবেন।

জেলার টিকরামপুর এলাকার আমচাষি মিলন আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বছর মুকুল আসার জন্য আবহাওয়া মৌসুমের শুরু থেকেই ভালো আছে। দিনের বেলায় যে তাপমাত্রা দরকার, রোদের মাধ্যমে সেটি পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে গাছে গাছে অনেক মুকুল এসেছে। এই রকম আবহাওয়া আরও ১০ দিন থাকলে আরও ভালো পরিমাণে মুকুল আসবে।’

আমচাষি সরিফুল ইসলাম সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘গতবছর মুকুল ভালো হলেও বাজারের বিপণনের সময় টানা বৃষ্টিতে আম নষ্ট হয়ে যায়। দাম না পাওয়ায় অনেক চাষি আর্থিক ক্ষতির শিকার হন। এ বছর ভালো মুকুল আর ভালো ফলনের আশাতেই সবাই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত আছি।’

আমচাষি মুকুল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আম চাষে আমাদের প্রচুর খরচ হয়। সার, কীটনাশক, পানি ও শ্রমিক সবকিছুতেই খরচ বেড়েছে। অথচ ধান, গম বা পাটের মতো অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে কৃষকরা সরকারি প্রণোদনা পেলেও আমচাষিরা তা পান না। সরকার যদি আমচাষিদের জন্যও প্রণোদনা দেয়, তাহলে আমরা আরও উৎসাহ নিয়ে উৎপাদনে মন দিতে পারব।’

জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী সারাবাংলাকে জানান, অনুকূল আবহাওয়ায় এরই মধ্যে ৭০ শতাংশ গাছে মুকুল এসেছে। চলতি মাসের শেষ পর্যন্ত মুকুল আসার সময় রয়েছে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ব্যাপক মুকুলের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তিনি জানান, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করা হচ্ছে ও চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, জেলায় ৩৭ হাজার ৪৮৭ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনেক বাগানে এরই মধ্যে মুকুল রক্ষায় ছত্রাক ও বালাইনাশক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি মৌমাছির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনারও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে পরাগায়ন ভালো হয় এবং ফলের গুটি বেশি ধরে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুকুল আসার পরবর্তী সময়টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত কুয়াশা, অকালবৃষ্টি বা তাপমাত্রার হঠাৎ পরিবর্তনে মুকুল ঝরে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সময়মতো পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।.

সব মিলিয়ে মৌসুমের শুরুতেই মুকুলে ছেয়ে যাওয়া আমবাগান চাঁপাইনবাবগঞ্জে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। গত বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ও ন্যায্য দাম পেতে চাষিরা এখন অনুকূল আবহাওয়া ও সহায়ক বাজার ব্যবস্থার দিকে তাকিয়ে আছেন। আবহাওয়া সহায়ক থাকলে এ বছরও আমের রাজধানীর বাগানগুলো সোনালি ফলনে ভরে উঠবে— এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর