সিলেট: ইফতারির অপরিহার্য কয়েকটি অনুষঙ্গের মধ্যে লেবু অন্যতম। রমজানকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সিলেটে লেবুর বাজারে লেগেছে আগুনের ছোঁয়া। গেল এক সপ্তাহ আগে খুচরা বাজারে হালি প্রতি ২০ টাকা দরে বিক্রি হলেও রমজানের প্রথম দিন থেকে এক লাফে বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা দামে। এই হিসেবে এক সপ্তাহ ব্যবধানে লেবুর দাম বেড়েছে কয়েকগুণ ।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সিলেটের বন্দর বাজারে গিয়ে দেখা যায় রমজানকে কেন্দ্র করে লেবুর চাহিদা তুঙ্গে—বেড়েছে কেনাবেচা। রমজান আসা মাত্র-ই বাজারে লেবু সংকট ও ব্যাপক চাহিদা থাকায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের সাধারণ ক্রেতারা। বাধ্য হয়ে কেউ কেউ হালি প্রতি ক্রয় করছেন আকারভেদে ৮০ টাকা থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত।
আতাউর রহমান নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘রোজায় লেবুর সরবত দিয়ে ইফতার করতে চাই। কিন্তু লেবুর দাম বাড়ায় চরম বিপাকে পড়েছি। ২০ টাকার লেবু ৮০ টাকা হালিতে বিক্রি হচ্ছে এমন হলে সাধারণ মানুষ কীভাবে লেবু কিনবে।’
এমন কথা শুনে তাল মিলিয়ে কথা বলেন উপস্থিত আরও কয়েকজন ক্রেতা। তারা জানান, রমজান উপলক্ষ্যে একশ্রেণির মুনাফা লোভী ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে নিদিষ্ট কয়েকটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়।
তবে এমন বক্তব্যের দ্বিমত পোষণ করে ময়মনসিংহের নাজমুল হাসান নামের এক লেবু ব্যবসায়ী (আড়তদার) বলেন, অনাবৃষ্টির কারণে বাজারে চাহিদার তুলনায় লেবু সংকটে রয়েছে। রমজানে লেবুর চাহিদা আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়—তাই লেবু বেশি দামে বাগান থেকে ক্রয় করে খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছে আমরা বিক্রি করছি।

সিলেটের সোবহানীঘাট সবজিবাজারের সামনে থেকে লেবু কিনছেন কয়েকজন ক্রেতা।
তার এই কথার সূত্র ধরে সিলেটের সবচেয়ে বড় পাইকারি আড়ত সোবহানীঘাটের সবজি মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, আগে ছোট সাইজের কাগজি লেবু ২০ টাকা হালিতে বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দামে। মাঝারি সাইজের লেবু বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা। বড় সাইজের লেবু ১৭৫ টাকা থেকে ২০০ টাকা হালি বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারের লেবু ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন জানান, পাইকারি বাজার থেকে ২০-৩০ টাকা বেশিতে পণ্য বিক্রি হয় খুচরা বাজারে। তবে কি কারণে পাইকারি বাজারের চেয়ে খুচরা বাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে তার সঠিক কারণ জানেন না তিনি।
ব্যবসায়ী কামাল উদ্দিন আরও জানান, বেশিরভাগ লেবু মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও ময়মনসিংহ এসব এলাকা থেকে আসে। রমজানকে কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ায় দামও বেড়েছে বলে তিনিও একই সুরে কথা বলেন। রমজানে লেবুর দাম চড়া থাকবে বলেও তিনি জানান। তবে রমজান শেষে অথবা বৃষ্টি হলে দাম স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ব্রম্মময়ী সবজি মার্কেটের এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, লেবু খুচরা বাজারে যেভাবে ক্রেতাদের গলা কাটা হচ্ছে সেটা ঠিক না। আমরা দাম কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছি। কম দামে পেলে খুচরা বাজারেও দাম কমে আসবে।
তবে একাধিক ক্রেতারা অভিযোগ করে বলেন, প্রতি বছর রমজানে চাহিদাকে পুঁজি করে কিছু ব্যবসায়ী লেবুর কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন।

লেবুর দাম আকাশ ছোঁয়া থাকায় ৮০ টাকা দামে পাকা লেবু কিনছেন এক ক্রেতা।
সিলেট নগরীর বাসিন্দা গৃহিণী শাহনাজ পারভিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রমজান আসলেই বাজার এলোমেলো হয়ে যায়। একটা লেবু নিম্নে ২০ থেকে ৫০ টাকা! এটা কীভাবে সম্ভব? নিম্নবৃত্তের মানুষের ইফতারিতে লেবু রাখা স্বপ্ন হয়ে যাবে।’ তিনি প্রশাসন, ব্যবসায়ী ও ভোক্তার বাজার মনিটরিং এর প্রতি আহ্বান জানান।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর সিলেট জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক দেবানন্দ সিনহা বলেন, ‘রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার এবং নিরাপদ খাদ্য দফতরের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা কাজ শুরু করেছি। কেউ কৃত্রিম সংকট তৈরি বা অতিরিক্ত মুনাফা করার চেষ্টা করলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’