Friday 20 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দেড় যুগ পর স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পেলেন বেলাল হায়দার

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৫ | আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:০৭

বেলাল হায়দার।

কক্সবাজার: ২০০৭ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার আনন্দটা ঠিকমতো উপভোগই করতে পারেননি বেলাল হায়দার। সহপাঠীরা যখন একে একে সরকারি চাকরিতে যোগ দিচ্ছেন, নতুন কর্মজীবনের স্বপ্ন বুনছেন, তখন তার নামের পাশে আটকে ছিল একটি শব্দ- ‘গেজেট স্থগিত’। তারপর কেটে গেছে ১৮ বছর। অনিশ্চয়তা, হতাশা, আইনি লড়াই আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার পথ পেরিয়ে অবশেষে সেই গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এখন বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের একজন চিকিৎসক।

বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দিয়েছেন তিনি। সাদা অ্যাপ্রন গায়ে, কাঁধে সরকারি দায়িত্ব। এই দৃশ্যটি তার জন্য শুধু একটি চাকরিতে যোগদান নয়, এটি দীর্ঘ এক অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং নতুন সূচনার প্রতীক।

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, ২০০৫ সালে অনুষ্ঠিত ২৭তম বিসিএসে অংশ নেন বেলাল হায়দার। ২০০৭ সালে গেজেট প্রকাশ হলে তিনি উত্তীর্ণ হয়েও তালিকাভুক্ত হননি। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখা হয়। ফলে একই ব্যাচের অন্যরা যোগ দিলেও তিনি পারেননি।

সেই সময়ের কথা মনে করে চিকিৎসক বেলাল হায়দার বলেন, ‘ফল প্রকাশের দিনটা আমার জীবনের অন্যতম আনন্দের দিন ছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই বুঝলাম, আমার জন্য পথটা সহজ নয়। অপেক্ষা শুরু হলো, কিন্তু সেই অপেক্ষার শেষ ছিল না।’

অবশেষে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হন। দীর্ঘদিন মামলার কার্যক্রম স্থবির ছিল। সময় পেরিয়েছে, সরকার বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মামলাটি নতুন করে গতি পায়। পরে হাইকোর্ট বিভাগে দীর্ঘ শুনানি শেষে আদালত ২৭তম বিসিএসের গেজেট প্রকাশ এবং তাঁকে স্বাস্থ্য ক্যাডারে পদায়নের নির্দেশ দেন। আদালতের সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে স্বাস্থ্য বিভাগ তাঁকে নিয়োগ দেয়।

গেজেট প্রকাশের খবর হাতে পাওয়ার মুহূর্তটি কেমন ছিল? এই প্রশ্নে চোখ ভেজা কণ্ঠে বেলাল হায়দার বলেন, “দেড় যুগ পর মনে হলো, যেন বুকের ওপর চাপা একটা পাথর সরে গেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি। এতদিনের কষ্ট, অপমান, অনিশ্চয়তা সবকিছুর একটা মূল্য ছিল।”

তিনি যোগ করেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ আমাকে পেকুয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ দিয়েছে, এটা আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি। এখন সরকারি চিকিৎসক হিসেবে নিজের এলাকার মানুষের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি, এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তি।’

বেলাল হায়দার কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেকুয়া উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণেই তাঁর গেজেট আটকে রাখা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

তবে এই দীর্ঘ সময়ে চিকিৎসা পেশা থেকে সরে যাননি তিনি। এমবিবিএস চিকিৎসক হিসেবে ব্যক্তিগত চেম্বার চালিয়ে স্থানীয় মানুষকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন। সরকারি পরিচয় না থাকলেও রোগীদের কাছে তিনি ছিলেন ‘ডাক্তার সাহেব’ই।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আব্দু শুক্কুর বলেন, ‘তিনি অনেক মানসিক কষ্টের মধ্যে ছিলেন। তবু রোগীদের ফিরিয়ে দেননি। এখন সরকারি হাসপাতালে যোগ দেওয়ায় আমরা খুশি।’

পেকুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক সংকটসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের যোগদান স্থানীয়দের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী আশা করছে, নিয়মিত ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য হবে।’

বেলাল হায়দার বলেন, “এই ১৮ বছর আমাকে ধৈর্য শিখিয়েছে। মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে। এখন আমি চাই, সরকারি দায়িত্বটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে।”

পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু বলেন, একসময় যে গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় তাঁর কর্মজীবন থমকে ছিল, আজ সেই গেজেটই তাঁর নতুন পরিচয়ের ভিত্তি। বেলাল হায়দারের গল্প কেবল একটি নিয়োগের নয়, এটি সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা এক মানুষের অধ্যবসায়, বিশ্বাস ও প্রত্যাবর্তনের গল্প।

বিজ্ঞাপন

চকরিয়ায় ট্রাকচাপায় বাবা-ছেলে নিহত
২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:১৯

আরো

সম্পর্কিত খবর