রংপুর: গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) শপথ নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা। শপথ অনুষ্ঠান টেলিভিশনে দেখার সময় তিস্তা চরের বাসিন্দাদের মুখে ভেসে ওঠে স্বস্তির চিহ্ন। তারা এরই মধ্যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে, এবার সত্যিই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে। রংপুর বিভাগ থেকে তিন পূর্ণমন্ত্রী ও এক প্রতিমন্ত্রীসহ চারজন মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ায় তিস্তার দুই তীরের লাখো মানুষ নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন।
টেলিভিশনের সামনে ভিড় করে দাঁড়ানো তিস্তাপাড়ের মানুষের কণ্ঠে একই আকুতি। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরের ষাটোর্ধ্ব মনিরুল ইসলাম সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আইজক্যা কাম-কাজ ফেলাচি বাহে। রোজার বাজারঘাটের চিন্তা নাই। দেকি, হামার পানিমন্ত্রী কি করে। এদ্দিন তো দ্যাকনো, হামার দুঃখ কায়ও দ্যাকে নাই। হামাক খালি ধোঁকা দিচে। এবার ভোট নিবার জন্যে সবায় কতা দিচে। এইবার তিস্তার কাম না হইলে আর হবার নয়।’
গজঘন্টা এলাকার শ্রমিক হোসেন আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘এক সময়ের বড় গেরস্ত হামরা। এই তিস্তায় হামাক ফকির বানাইচে। নয়া সরকার যদি কাম না করে, হামার মরণ ছাড়া বুদ্দি নাই।’ গৃহবধূ মুঞ্জেরা বেগমের বর্তমান সরকার প্রধান প্রসঙ্গ টেনে বলেই ফেললেন, ‘ভোটের আগোত এই তারেক রহমান তো তিস্তার কতা কইচে। হামরা তো সেই আশায় আচি।’
বন্যার পানি সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর রংপুরের পাঁচ জেলায় ৭৩৪টি চরে এখন রবিশস্যের আবাদ চলছে। কোথাও কোথাও নদীর অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। তবু শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির জন্য হাহাকার, বর্ষায় ভয়ংকর ভাঙন। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, তিস্তায় স্বাভাবিকভাবে যেখানে ন্যূনতম ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে প্রায়ই ২০০-৬০০ কিউসেকের নিচে নেমে যায়। ভারতের উজানের বাঁধের কারণে পানিপ্রবাহ ৮০-৯০ শতাংশ কমেছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গত ১০ বছরে তিস্তার ভাঙনে চার লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। উত্তরের সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ জেলা— রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধা মূলত তিস্তার পাড় ঘেঁষে। এখানকার দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নদীর ওপর নির্ভরশীল।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান রিপন সারাবাংলাকে বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত কোনো সরকারই তিস্তার সঠিক পরিচর্যা করেনি। বরং, নদীকে অভিশাপ বানিয়ে ফেলা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘তিস্তাপাড়ের কৃষক, দিনমজুর, দোকানি, রিকশাচালক— সবাই জানেন, মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, সেচের নিশ্চয়তা ও নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। এখন শুধু অপেক্ষা—নতুন সরকার কত দ্রুত কাজ শুরু করে।’
তিস্তা নিয়ে গবেষণা করা এই শিক্ষকের মতে, তিস্তা আর শুধু নদী নয়, উত্তরবঙ্গের ভাগ্যের প্রতীক। এবারের সরকার যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, তাহলে তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিশাপ হয়তো আশীর্বাদে রূপ নেবে।
উল্লেখ্য, গত ৩০ জানুয়ারি রংপুর ঈদগাহ মাঠের নির্বাচনি জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান স্পষ্ট ঘোষণা দেন, ‘বিএনপি সরকার গঠন করলে এই এলাকার মানুষের স্বপ্ন পূরণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজে যথাসম্ভব দ্রুত আমরা হাত দেব।’
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও এখন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তিস্তা নিয়ে রংপুরের মানুষ জেগে উঠেছে। নদীপাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ নামে পরিচিত এই মহাপরিকল্পনার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ধাপে (২০২৬-২০২৯) ব্যয় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যার মধ্যে চীনের কাছ থেকে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ঋণ চাওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নথি জমা ও আলোচনা এগিয়েছে; চীনের সম্মতি পেলেই কাজ শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পে রয়েছে নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ ও মেরামত, চর উদ্ধার, স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলা, সবুজ করিডর এবং ভূমি পুনরুদ্ধার।