খুলনা: ১৯৭৮ সাল। খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের যুগিহাটী গ্রামের ব্যবসায়ী বনি আমিন বিশ্বাসের সঙ্গে বিয়ে হয় রাশিদা আক্তারের। সংসার জীবন ভালোই চলছিল। এক বছরের মাথায় তাদের ঘর আলো করে আসে প্রথম কন্যাসন্তান। যদিও পর পর আরও দু’টি কন্যা সন্তানের জন্ম তাদের ঘরে। কিন্তু, বিয়ের ১৫ বছরের মাথায় হঠাৎ একদিন মারা যান রাশিদা আক্তারের স্বামী বনি আমিন বিশ্বাস। ছেলে না হয়ে ঘরে তিনটি মেয়ে থাকায় রাশিদা আক্তারের জীবনে নেমে আসে শ্বশুর বাড়ির লোকজনের অমানবিক নির্যাতন। এর পরেই শুরু হয় তার জীবন সংগ্রাম।
সম্প্রতি সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় জীবন সংগ্রামে জয়ী রাশিদা আক্তারের। তিনি বলেন, ‘আমাদের সংসার অনেক সুখের ছিল। বিয়ের একবছর পর আমাদের ঘরে প্রথম মেয়ে সন্তান জন্ম নেয়। এর পাঁচ বছর পর মেজ মেয়ের জন্ম হয়। ওই সময় আমার স্বামীর ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছিল। তিনি এক্সপোর্টের ব্যবসা করতেন। উপসাগরীয় যুদ্ধের কারণে ব্যবসাটি বন্ধ হয়ে গেলে আমরা গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। এর পর আমার ছোট মেয়ে পৃথিবীতে আসে। এর পরই শুরু হয় আমার জীবন সংগ্রামের কাহিনি। আামার বড় মেয়ের বয়স যখন ১৫ মাস বয়স তখন হঠাৎ একদিন সম্পত্তি নিয়ে আমার ভাসুরের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। এর পর পরই বুকে ব্যাথা ওঠে তিনি মারা যান।’
তিনি বলতে থাকেন, ‘এর কিছুদিন পর সম্পত্তি নিয়ে আবার সবাই বসেন। আমার দুই ভাসুর তাদের ভাগের পৈতৃক সম্পতির প্রায় সবটুকু বিক্রি করে ফেলেছিল। বাকি ছিল আমার স্বামীর সম্পত্তি টুকুই। ওই সম্পত্তির ভাগিদার আমার তিন মেয়ে। এজন্য আমার মেয়েদের কেউ সহ্য করতে পারছিল না। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, সিঁড়ির সামনে দেখি কে বা কারা বোমা রেখে গেছে। পরে আমাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে বোমা উদ্ধার করে ফাঁকা মাঠের ভেতরে নিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, ‘তখন পুলিশ আমাদের বাড়িতে গিয়েছিল। তারা থেকে বোমাটি নিষ্ক্রিয় করে। কিছু দিন পর আমরা বাইরে গেলে জানালা দিয়ে ঘরের মধ্যে পেট্রোল ঢেলে রেখে চলে যায়। স্বামীর ভিটা ছেড়ে যাতে আমরা চলে যাই সেজন্য নানা ভয় দেখানো হত। এরকম অবস্থা চলতে চলতে কিছুদিন পর শুনি যে, আমার ভাসুর আমাদের জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু আমরা কিছুই জানি না। আমার বড় ননদের ছেলে ছিলেন ওই এলাকার চেয়ারম্যান। তিনি যেটুকু জমি দিয়েছেন আমরা সেটুকু পেয়েছি। কিছুদিন পর শুনি সেই জমিও আমার ভাসুর বিক্রি করে দিয়েছেন। এভাবে চলতে চলতে বড় মেয়ে এসএসসি পাস করল। এরপর এইচএসসিতেও ভালো রেজাল্ট করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়।’
রাশিদা বলেন, ‘সেখানেই এখন মাস্টার্স-এ পড়াশোনা করছে বড় মেয়ে। আর আমার মেজ মেয়ে বড় হলে ইসলামিক রিলিফের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তারা আমাদের সবদিক থেকে সহযোগিতা করে। আস্তে আস্তে আমার মেয়েরা বড় হয়। আমার দুই মেয়েই বৃত্তি পেয়েছে। তারা তাদের বৃত্তির টাকা দিয়েই লেখাপড়া চালিয়ে গেছে। মেজ মেয়ে মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পর ১৮ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার কারণে ইসলামি রিলিফ থেকে তখন নাম কেটে দেয়। তখন এতটাই অর্থ কষ্টে ছিলাম যে, মেয়ে মেডিকেলে চান্স পাওয়ার পরও একবছর ভর্তি করতে পারিনি। এখন অবশ্য মেয়ে আমার মেডিকেলে পড়ছে।’
তিনি বলেন, ‘ছোট মেয়ে মাদরাসায় পড়াশোনা করছে। মেয়েরা বংশ রক্ষা করতে পারবে না, এসব কাহিনি চলতেই থাকে। এর মধ্যে ইসলামি ফাউন্ডেশনে একটি চাকরি পেয়ে যাই। আমার স্বামী মারা যাওয়ার আগে আমি ডিগ্রিতে ভর্তি হয়েছিলাম। পরে আমি ডিগ্রি পাস করি। এরপর মাস্টার্সও শেষ করি। স্বামী মারা যাওয়ার দুই বছর পর আমার বাবা মারা যায়। বাড়ির বাইরে গিয়ে যে চাকরি করব, সে সুযোগও ছিল না।’
রূপসা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফারহানা ইয়াসমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাশিদা আক্তারের মতো সংগ্রামী নারীরা সকল নারীর জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি তার অসামান্য অবদান ও সাফল্যের জন্য অদম্য নারী সম্মাননা লাভ করেছেন।’
উল্লেখ্য, নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী রাশিদা আক্তার। তিনি আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ও বেগম রোকেয়া দিবস উদযাপন উপলক্ষে রূপসা উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় আয়োজিত শ্রেষ্ঠ অদম্য নারীদের সম্মাননা পেয়েছে। এ বছর তাকে ‘সংগ্রামে জয়ী’ নারী ক্যাটাগরিতে সম্মাননা দেওয়া হয়।