বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই উৎসবের তালিকায় শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটটি বোধহয় নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখেরই প্রাপ্য। বৈশাখ মানেই তপ্ত রোদেও এক পশলা প্রশান্তি, নতুন হালখাতা আর লাল-সাদা রঙে রাজপথের ম ম গন্ধ। এই দিনে বাঙালি নারীর সাজের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে শাড়ি। তবে চিরাচরিত অভ্যাসের বাইরে গিয়ে শাড়ি পরার ধরনেও এখন এসেছে আধুনিকতার ছাপ। আগেকার দিনের মতো শুধু প্যাঁচানো শাড়িতে সীমাবদ্ধ না থেকে এখনকার তরুণীরা ট্র্যাডিশন এবং ট্রেন্ডের এক দারুণ মেলবন্ধন ঘটাচ্ছেন। বৈশাখের সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রা থেকে শুরু করে বিকেলের আড্ডা কিংবা রাতের দাওয়াত প্রতিটি মুহূর্তের জন্য শাড়ি পরার আলাদা শৈলী আপনার ব্যক্তিত্বে নিয়ে আসতে পারে এক অনন্য মাত্রা।
ঐতিহ্যের আটপৌরে আভিজাত্য
যারা আভিজাত্য এবং শুদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতি বেশি অনুরক্ত, তাদের জন্য ধ্রুপদী আটপৌরে ঢঙের কোনো বিকল্প নেই। পুরনো ঢাকার বনেদি পরিবারের নারীদের মতো করে শাড়ির আঁচল দুই কাঁধ দিয়ে সামনে ঝুলিয়ে রাখার এই স্টাইলটি পহেলা বৈশাখের আমেজের সাথে সবচেয়ে বেশি মানানসই। এই স্টাইলে শাড়ি পরলে আঁচলের কোণায় রুপোর চাবির গোছা বা কোনো অ্যান্টিক গয়না ঝুলিয়ে দিলে তাতে আভিজাত্যের পূর্ণতা পায়। এক্ষেত্রে তাঁত, জামদানি বা খাদি শাড়ি সবচেয়ে ভালো দেখায়। খোঁপায় একগুচ্ছ বেলি ফুলের মালা আর কপালে বড় একটি লাল টিপ। এই সাজে আপনি যেন ঠিক সেই হারানো দিনের রূপকথার বাঙালি নারী, যার উপস্থিতি উৎসবের মেজাজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। বড় বড় করে দেওয়া কুঁচি আর কাঁধের ওপর সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখা চওড়া আঁচল আপনাকে ভিড়ের মাঝেও দেবে এক স্বতন্ত্র আভিজাত্য।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় ফিউশন ড্র্যাপিং
শাড়ি পরার ক্ষেত্রে এখন তরুণ প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ফিউশন স্টাইল। যারা শাড়ি সামলাতে একটু ভয় পান বা দীর্ঘ সময় বাইরে হইচই করে কাটাবেন, তারা বেছে নিতে পারেন প্যান্ট স্টাইল বা ধুতি স্টাইল ড্র্যাপিং। এই শৈলীতে শাড়ির সাথে লেগিংস বা ধুতি প্যান্ট পরে শাড়িটিকে এমনভাবে প্যাঁচানো হয় যাতে তা আধুনিক পশ্চিমী পোশাকের মতো দেখায়। এটি কেবল দেখতেই স্মার্ট নয়, বরং রোদে মেলায় হাঁটাচলা করতে বা রিকশায় যাতায়াত করতেও বেশ আরামদায়ক। এর সাথে একটি চওড়া চামড়ার বেল্ট বা কাপড়ের বেল্ট কোমরবন্ধনী হিসেবে ব্যবহার করলে তা আপনার অবয়বকে আরও সুসংগঠিত এবং স্লিম দেখাবে। এই আধুনিক কায়দায় শাড়ি পরলে ব্লাউজের ক্ষেত্রেও দারুণ এক্সপেরিমেন্ট করা যায়; যেমন—হাই নেক ক্রপ টপ বা কন্ট্রাস্ট শার্টের ওপর শাড়ি পরে আপনি হয়ে উঠতে পারেন পহেলা বৈশাখের ভিড়ে আধুনিকতার প্রতিচ্ছবি।
স্নিগ্ধতায় ঘেরা একপ্যাঁচে স্টাইল
বিকেলের আড্ডা বা বন্ধুদের সাথে সময় কাটানোর জন্য ‘নভি ড্র্যাপ’ বা সাধারণ একপ্যাঁচে শাড়ি পরা এখনকার সময়ের অন্যতম সেরা পছন্দ। এই স্টাইলে শাড়ির কুঁচিগুলো একটু বড় ও ঢিলেঢালা রাখা হয় এবং আঁচলটি পিন না করে বাম কাঁধ দিয়ে আলতো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এতে করে সাজে যেমন একটি আলগা স্নিগ্ধতা থাকে, তেমনি এটি পরে থাকাটাও বেশ সহজ ও আরামদায়ক। বিশেষ করে সুতি, লিনেন বা কোটা শাড়ির ক্ষেত্রে এই ঢংটি অসাধারণ দেখায় কারণ তা গরমে শরীরের সাথে সেঁটে থাকে না এবং বাতাসে বেশ ওড়ে। এর সাথে কানে বড় ঝুমকো আর হাতে একরাশ মাটির বা কাঁচের চুড়ি পরলে আপনার সাধারণ সাজেই আসবে নান্দনিক ছোঁয়া। বড় চুলে আলগা বিনুনি বা হালকা কার্ল করে চুল ছেড়ে দিলে তা এই স্টাইলের সাথে দারুণ মানিয়ে যায়, যা আপনাকে করে তুলবে স্নিগ্ধ ও লাবণ্যময়।
কাপড়ের বুননে স্বস্তির খোঁজ
সবশেষে বলা যায়, শাড়ি পরার স্টাইল যাই হোক না কেন, বৈশাখের সাজে স্বস্তি থাকাটা সবচেয়ে জরুরি। তীব্র গরম আর আর্দ্রতার কথা মাথায় রেখে ফ্যাব্রিক নির্বাচনে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। সুতি, কোটা বা হ্যান্ডলুমের শাড়িগুলো যেমন ঘাম শুষে নেয়, তেমনি এগুলো যেকোনো স্টাইলে পরলে ফুটে ওঠে দারুণ গাম্ভীর্য। শাড়ির রঙের ক্ষেত্রে এখন লাল-সাদার ধরাবাঁধা গণ্ডি পেরিয়ে হলুদ, বাসন্তী, ফিরোজা বা কচি কলাপাতা রঙের ব্যবহারও চোখে পড়ার মতো। আপনি যেভাবে শাড়ি পরুন না কেন, তার সাথে যদি যুক্ত হয় আপনার আত্মবিশ্বাস আর প্রাণখোলা হাসি, তবে সেই সাজই হয়ে উঠবে সেরা। বৈশাখী মেলা হোক বা পারিবারিক অনুষ্ঠান, নিজের পছন্দের শৈলীতে শাড়ি জড়িয়ে উৎসবে মেতে উঠুন নিজস্ব মহিমায়। মনে রাখবেন, সঠিক স্টাইল আপনার ব্যক্তিত্বকে যেমন ফুটিয়ে তোলে, তেমনি সঠিক কাপড় আপনাকে সারাদিন চনমনে রাখতে সাহায্য করে।
প্রচ্ছদের ছবি: সংগৃহীত