ঢাকা: অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবন শুরু করা সহজ নয়। উচ্চ টিউশন ফি আর ব্যয়বহুল জীবনযাপন অনেককে শুরুতেই থামিয়ে দেয়। প্রতিদিনের সংগ্রামও কম নয়। তবুও সেই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই এক তরুণ বাংলাদেশি নিজের ভাগ্য নতুন করে লিখেছেন। তিনি হিমি হোসেন। শূন্য হাতে শুরু করে তিনি আজ অস্ট্রেলিয়া ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অঙ্গনে পরিচিত এক সফল উদ্যোক্তা। তার গল্প দেখায়, ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রম থাকলে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে ওঠে। আর এভাবেই প্রবাসে বাংলাদেশি তরুণরা শূন্য থেকেই যেন সাম্রাজ্য গড়েন।
অস্ট্রেলিয়ায় হিমির যাত্রা শুরু ১৯৯৯ সালে। পড়াশোনা শেষ করে তিনি যোগ দেন এএনজেড ব্যাংকে। ধীরে ধীরে দক্ষতা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে পৌঁছে যান আইটি স্ট্রাটেজি ম্যানেজার পদে। করপোরেট দুনিয়ায় ১২ বছরের অভিজ্ঞতা তাকে স্থিতি দিলেও, ভেতরে ছিল আরেকটি স্বপ্ন। তিনি চাইতেন নিজের কিছু করতে। নিজের সাম্রাজ্য গড়তে। সেই ইচ্ছাই তাকে ভাবিয়ে তুলত। চাকরির নিরাপত্তা কি সত্যিই তার শেষ গন্তব্য?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ২০১৬ সালে তিনি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। চাকরি ছেড়ে দেন। শুরু করেন ছোট একটি ব্যবসা দিয়ে। শুরুটা ছিল কঠিন। আর্থিক সংকট আর অনিশ্চয়তা তাকে প্রতিদিনই ভাবিয়ে তুলত সিদ্ধান্তটি ঠিক ছিল কি না। কখনো মনে হতো আবার চাকরিতে ফিরতে হবে। কিন্তু তিনি থামেননি। প্রতিটি ব্যর্থতা তাকে আরও দৃঢ় করেছে। প্রতিটি বাধা তাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে। ধীরে ধীরে তার ছোট ব্যবসা বড় হতে থাকে। সেই পথ ধরে তিনি গড়ে তোলেন ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, মাইগ্রেশন সার্ভিস, প্রপার্টি, কনস্ট্রাকশনসহ আরও কয়েকটি উদ্যোগ।
সময়ের সঙ্গে তার ব্যবসা অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি স্টেটে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে প্রায় ২০০ কর্মী কাজ করছেন তার গ্রুপে। শুধু অস্ট্রেলিয়াই নয়, তার ব্যবসা পৌঁছে গেছে ফিজি, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশেও। আরও কয়েকটি দেশে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও চলছে। এই বিস্তারের মধ্যেই তিনি ২০২০ সালে লেখেন তার প্রথম বই ‘Fire Your Boss’। বইটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করে। বইটি তার ব্যক্তিগত যাত্রার মতোই পাঠকদের সামনে তুলে ধরে স্বাধীনতার দর্শন নিজের মেধা দিয়ে নিজের পথ তৈরি করার আহ্বান।
বাংলাদেশের প্রতি তার টানও গভীর। বর্তমানে বাংলাদেশে তার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৮০ জন কর্মী কাজ করছেন। বিশেষ করে ডিজিটাল মার্কেটিং খাতে তাদের কাজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত। হিমির বিশ্বাস, বাংলাদেশিরা মেধাবী এবং সুযোগ পেলে তারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করতে পারে। তাই তিনি চান, অস্ট্রেলিয়ায় আসা নতুন প্রজন্ম শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার সাহস দেখাক।
ব্যবসার বিস্তারের পাশাপাশি কমিউনিটির জন্যও কাজ করছেন তিনি। মেলবোর্নে থাকলেও ব্যবসার প্রয়োজনে নিয়মিত সিডনি যাতায়াত করেন। সম্প্রতি সিডনির বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকা লাকেম্বায় একটি পুরো বিল্ডিং কিনে তিনি আলোচনায় আসেন। সেখানে তিনি গড়ে তুলছেন একটি আধুনিক কমিউনিটি হাব। থাকবে হালাল সুপারমার্কেট, রিয়েল এস্টেট অফিস, মিডিয়া ইউনিটসহ নানা উদ্যোগ। তার ভাষায়, এটি হবে এমন একটি জায়গা যেখানে কমিউনিটি, ব্যবসা ও সংস্কৃতি একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।
হিমি হোসেনের গল্প শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়। এটি এক অভিবাসীর সংগ্রাম, সাহস আর স্বপ্নের গল্প। যে যাত্রা দেখায়, শূন্য থেকে শুরু করেও মানুষ অনেক দূর যেতে পারে যদি সে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখে এবং স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে যায়।