Monday 13 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চৈত্র সংক্রান্তি: বিদায়ী চৈত্রের দহন শেষে নতুনের আবাহন

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:০৫

বাংলা বর্ষপঞ্জির শেষ দিনটি অর্থাৎ চৈত্র মাসের শেষ দিনটিই হলো চৈত্র সংক্রান্তি। এটি বাঙালির আবহমান সংস্কৃতির এক গভীর শিকড়লগ্ন উৎসব, যা মূলত বিদায় এবং নতুনের আবাহনের এক সন্ধিক্ষণ। গ্রামবাংলা থেকে শুরু করে নগরেও চৈত্র সংক্রান্তি এক বিশেষ মহিমায় পালিত হয়, যা আমাদের কৃষি ঐতিহ্য এবং প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত।

চৈত্র সংক্রান্তির ঐতিহ্য ও উৎসবের পটভূমি

চৈত্র সংক্রান্তি মূলত একটি বিদায়ি উৎসব হলেও এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে পুনর্জাগরণের আনন্দ। হাজার বছর ধরে বাংলার কৃষক সমাজ এই দিনটিকে অত্যন্ত ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে আসছে। চৈত্র মাসের শেষে যখন গ্রীষ্মের প্রখরতা বাড়ে এবং প্রকৃতিতে রুক্ষতা দেখা দেয়, তখন এই সংক্রান্তি পালনের মাধ্যমে অমঙ্গলকে দূর করার প্রার্থনা জানানো হয়। প্রাচীন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনটিতে সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন করে, যাকে ‘সংক্রান্তি’ বলা হয়। কৃষিপ্রধান এই জনপদে পুরোনো ফসল ও ঋতুর হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের প্রত্যাশায় এই দিনটি হয়ে ওঠে এক বিশাল মিলনমেলা।

বিজ্ঞাপন

গাজন উৎসব ও চড়ক পূজার আধ্যাত্মিকতা

চৈত্র সংক্রান্তির সবচেয়ে বর্ণিল ও রোমহর্ষক দিক হলো গাজন উৎসব এবং চড়ক পূজা। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে এই উৎসবের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। শিব ও গৌরীকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসবে ভক্তরা সন্ন্যাস গ্রহণ করেন এবং নানা কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে নিজেদের ভক্তি প্রদর্শন করেন। চড়ক গাছকে কেন্দ্র করে শূন্যে ঝুলে থাকা বা শরীরের বিভিন্ন অংশে বাণ ফোঁড়ানোর মতো দৃশ্যগুলো হয়তো কিছুটা শিহরণ জাগানিয়া, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিক বিশ্বাস। মানুষের বিশ্বাস, এ ধরনের ত্যাগের মাধ্যমে বিগত বছরের সব পাপ ও গ্লানি ধুয়ে মুছে যায় এবং আগামী বছরে সমৃদ্ধি ও সুখ আসে।

খাদ্য সংস্কৃতি এবং তিতো-তেতো খাবারের গুরুত্ব

চৈত্র সংক্রান্তির সাথে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের এক অদ্ভুত স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টিতে রোগের প্রকোপ কমাতে বিশেষ সব খাবারের আয়োজন করা হয়। এদিন সাধারণত মাছ বা মাংস বর্জন করে নিরামিষ আহারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিশেষ করে নিম পাতা, উচ্ছে বা তিতো করলা দিয়ে তৈরি ‘তেতো’ খাবার খাওয়ার প্রথা এদিনের আবশ্যিক অংশ। গ্রামবাংলার গৃহিণীরা এদিন কয়েক পদের কুড়ানো শাক বা শাকান্ন রান্না করেন, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। এছাড়াও দই-চিঁড়া, গুড় আর মুড়ির ফলাহার দিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয়, যা দীর্ঘদিনের এক অকৃত্রিম বাঙালি রীতিনীতি।

সংস্কৃতির সেতুবন্ধন ও মেলা

চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে দেশের আনাচে-কানাচে বসে বৈচিত্র্যময় মেলা। এই মেলাগুলো কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, বরং এটি লোকসংস্কৃতির এক বিশাল প্রদর্শনী। মাটির তৈরি তৈজসপত্র, কাঠের পুতুল, নাগরদোলা আর মুড়ি-মুড়কির মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ। কৃষকরা তাদের সারা বছরের কষ্টার্জিত ফসলের হিসাব মেলাতে মেলাতে একটু অবসরের স্বাদ খোঁজেন এই উৎসবের মাঝে। চৈত্র সংক্রান্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সময় থেমে থাকে না—ব্যর্থতা আর মলিনতাকে বিদায় জানিয়ে নতুন বৈশাখকে বরণ করে নেওয়াই জীবনের অমোঘ নিয়ম। চৈত্র সংক্রান্তির বিদায় বেলার এই বিষাদই যেন পহেলা বৈশাখের নতুন সূর্যের পথ প্রশস্ত করে দেয়।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর