ইউরোপের কোনো প্রাচীন শহরের পাথুরে পথ ধরে হাঁটছেন, হয়তো বেলজিয়ামের ব্রাসেলসের গ্র্যান্ড প্লেস বা এই জাতীয় কোনো ঐতিহাসিক চত্বর। সেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে নিখুঁত এক মূর্তি। সোনালি রঙে মোড়া, চোখে চশমা, হাতে গিটার।দেখলে মনে হয় কোনো শিল্পীর তৈরি ভাস্কর্য। পাশ দিয়ে হাঁটা মানুষজন একবার তাকায়, কেউ ছবি তোলে, কেউ আবার পাশ কাটিয়ে চলে যায়। হঠাৎ কয়েকজন শিশু থেমে যায়। কৌতূহলী চোখে তারা একে অপরের দিকে তাকায় ‘এটা কি সত্যিই মূর্তি?’
একজন এগিয়ে আসে, সাহস করে হাত বাড়ায়। আর ঠিক তখনই – মূর্তিটা হালকা নড়ে ওঠে!
একজন চমকে পেছনে লাফ দেয়, আরেকজন চিৎকার করে ওঠে, তারপরই চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে হাসির রোল। ভয়ের সঙ্গে মিশে যায় মজা, বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দ। এই ছোট্ট মুহূর্তটাই আসলে স্ট্যাচু বাস্কিংয়ের আসল জাদু।

আপাদমস্তক উজ্জ্বল সোনা; টুপি, কোট, প্যান্ট, এমনকি হাতে থাকা ব্যাগ আর গিটারটিও মনে হচ্ছে খাঁটি সোনা দিয়ে মোড়া। চোখে বড় বড় সানগ্লাস। রোদ লেগে গা থেকে যেন ঠিকরে পড়ছে আভা। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও বোঝার উপায় নেই এটি কোনো মানুষ নাকি ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্য। এই যে ভয় আর আনন্দের এক সেকেন্ডের রোমাঞ্চ, এটাই হলো ‘লিভিং স্ট্যাচু’ বা জীবন্ত ভাস্কর্যের আসল সার্থকতা।
শিল্পের আবরণে বেঁচে থাকার লড়াই
বিদেশের রাজপথে এই দৃশ্যগুলো কেবল বিনোদন নয়, এটি একটি সুশৃঙ্খল পেশা। একে বলা হয় ‘স্ট্যাচু বাস্কিং’। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোতে এই শিল্পীদের নির্দিষ্ট জায়গা পেতে রীতিমতো লাইসেন্স বা অনুমতি নিতে হয়। তারা কেবল ভিক্ষা চাইছেন না, বরং তারা একজন দক্ষ মূকাভিনেতা বা পারফর্মার। হিমাঙ্ক ছুঁইছুঁই শীত হোক বা কাঠফাটা রোদ, তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একইভাবে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। চোখের পলক ফেলাও যেন এখানে নিষিদ্ধ। তারা জানেন ঠিক কখন নড়লে পথচারীরা সবচেয়ে বেশি মজা পাবেন। বিশেষ করে বাচ্চাদের সাথে তাদের খুনসুটি পর্যটনের এক বড় আকর্ষণ। এই সোনালী বা রূপালী আস্তরণ তৈরি করতে বিশেষ ধরনের থিয়েট্রিক্যাল মেকআপ ব্যবহার করা হয়, যা দীর্ঘক্ষণ ত্বকে থাকলেও ক্ষতি করে না।

স্ট্যাচু বাস্কিং: ইতিহাসের ভেতরের বাস্তব গল্প
স্ট্যাচু বাস্কিং (লিভিং স্ট্যাচু) কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া আধুনিক বিনোদন নয়। এর শিকড় অনেক পুরোনো রাস্তার শিল্প ও মানব-ভাস্কর্যধর্মী অভিনয়ের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এটি নির্দিষ্ট কোনো এক বছরে বা একক ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয়নি; বরং ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলের পারফরমিং আর্টের ধারাবাহিকতায়।
প্রাচীন ভাস্কর্য অনুকরণ থেকে ধারণার শুরু
মানুষ নিজের শরীরকে শিল্পের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে বহু আগে থেকেই। প্রাচীন গ্রিস ও রোমে ভাস্কর্যের প্রতি যে আকর্ষণ ছিল, তার প্রভাব অভিনয় ও শরীরভিত্তিক পারফরম্যান্সেও পড়েছিল। যদিও তখনকার শিল্পীরা সরাসরি ‘মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা’ পারফরম্যান্স করতেন, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই, কিন্তু শরীরকে স্থির রেখে ভাস্কর্যের ভঙ্গি অনুকরণ করার ধারণা সেখান থেকেই এসেছে বলে গবেষকরা মনে করেন।
মধ্যযুগ ও রেনেসাঁ: রাস্তার শিল্পের বিস্তার
ইউরোপের মধ্যযুগে এবং পরে রেনেসাঁ সময়ে রাস্তার শিল্প বা বাস্কিং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখনকার শিল্পীরা গান, জাদু, কৌতুক বা অভিনয়ের মাধ্যমে জনতার সামনে পারফর্ম করতেন এবং বিনিময়ে অর্থ পেতেন।

এই সময় থেকেই ‘বাস্কিং’ শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়। যার অর্থ জনসমক্ষে পারফর্ম করে স্বেচ্ছা অনুদান গ্রহণ করা। তবে তখনো ‘লিভিং স্ট্যাচু’ আলাদা একটি ধারায় পরিণত হয়নি।
বিশ শতকে আধুনিক স্ট্যাচু বাস্কিংয়ের উত্থান
বর্তমান অর্থে স্ট্যাচু বাস্কিং মূলত বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৯৬০–৭০-এর দশকে বিভিন্ন ইউরোপীয় শহরে রাস্তার পারফরম্যান্স নতুনভাবে বিকশিত হয়।
ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি ও নেদারল্যান্ডসের শহরগুলোতে শিল্পীরা নতুন ধরনের পারফরম্যান্স নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। তখনই ‘মানুষ নিজেই মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে’। এই ধারণাটি একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ হিসেবে গড়ে ওঠে।
প্রযুক্তির যুগেও কেন টিকে আছে?
আজকের ডিজিটাল যুগে, যেখানে বিনোদনের অসংখ্য মাধ্যম রয়েছে, সেখানে স্ট্যাচু বাস্কিং এখনো জনপ্রিয়। কারণ এটি সরাসরি, বাস্তব এবং মানবিক। এখানে কোনো স্ক্রিন নেই, কোনো এডিট নেই। শুধু একজন মানুষ তার শরীর ও ধৈর্য দিয়ে শিল্প সৃষ্টি করছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর শক্তি। মানুষ এখনো থেমে যায়, তাকিয়ে থাকে, অবাক হয়।কারণ এমন দৃশ্য প্রতিদিন দেখা যায় না।
দিনশেষে সার্থকতা
বিদেশের রাজপথে এই ‘গোল্ডেন ম্যান’ এক জীবন্ত জাদুঘর বানিয়ে রাখেন। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় তারা যেন একেকটি ছোট ছোট ‘পজ’ বা বিরতি। দিনশেষে তাদের সেই ছোট বাটিতে জমা হওয়া প্রতিটি মুদ্রা আসলে একেকটি মানুষের তৃপ্তির স্বাক্ষর। রাজপথ যখন মঞ্চ হয়ে ওঠে, তখন জীবন আর জীবিকা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় এক অদ্ভুত নান্দনিকতায়।
ছবি: লেখক