দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে যখন নাৎসি জার্মানির পতন ঘণ্টা বাজছিল, তখন পরাজিত বাহিনীর লুট করা সম্পদ সরিয়ে ফেলার মরিয়া চেষ্টা থেকে জন্ম নেয় ইতিহাসের এক অন্যতম বড় রহস্য ‘নাৎসি গোল্ড ট্রেন’। লোকগাথা আর ধোঁয়াশাচ্ছন্ন ইতিহাসের মিশেলে এই কাহিনিটি আজ আট দশক ধরে অভিযাত্রী ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। মূলত পোল্যান্ডের লোয়ার সাইলেসিয়া অঞ্চলের ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় এই রহস্যের জাল।
প্রজেক্ট রাইজ ও ভূগর্ভস্থ গোলকধাঁধা
এই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হিটলারের উচ্চাভিলাষী এবং গোপন প্রকল্প ‘প্রজেক্ট রাইজ’। আউল পর্বতমালায় খোদাই করা এই বিশাল সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্কটি ছিল নাৎসিদের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। ইতিহাসবিদদের মতে, যুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রশক্তির বিমান হামলা থেকে বাঁচতে এবং গোপন গবেষণাগার তৈরির লক্ষ্যে এই প্রকাণ্ড স্থাপত্যশৈলী নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের কোনো পূর্ণাঙ্গ ব্লুপ্রিন্ট বা মানচিত্র পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, এই গোলকধাঁধার মতোই সুড়ঙ্গের কোনো এক চোরাপথেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেই ৩০০ টন স্বর্ণবাহী ট্রেনটি।
রুইশে-ব্রোকলা রুটের সেই হারিয়ে যাওয়া ক্ষণ
১৯৪৫ সালের মে মাসে যখন সোভিয়েত লাল ফৌজ পোল্যান্ডের বর্তমান রোকলা (তৎকালীন ব্রেসলাউ) শহরের দিকে ধেয়ে আসছিল, ঠিক তখনই নাৎসিরা তাদের যাবতীয় সঞ্চিত সোনা ও মূল্যবান সম্পদ নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ওয়ালব্রজিখ অভিমুখে রওনা দেয়। তেরোটি বগির সেই বিশাল বহরটি পাহাড়ের আড়ালে প্রবেশ করার পর আর কোনো দিন লোকচক্ষুর সামনে আসেনি। গবেষকদের একাংশ মনে করেন, ট্রেনটিকে লুকিয়ে ফেলার পর নাৎসিরা সুড়ঙ্গের মুখগুলো ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল, যাতে তা চিরতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।
২০১৫ সালের উন্মাদনা ও বাস্তবতার কষাঘাত
দীর্ঘকাল এই বিষয়টি নিছক গালগল্প হিসেবে পরিচিত থাকলেও ২০১৫ সালে পিয়োতর কোপার ও আন্দ্রেজ গাইকের দাবি বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তারা ওয়ালব্রজিখের নিকটবর্তী রেললাইনের ৬৫তম কিলোমিটারে মাটির নিচে একটি কাঠামো খুঁজে পাওয়ার দাবি জানান। পোল্যান্ডের উপ-সংস্কৃতি মন্ত্রীও তখন বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট ইতিবাচক ছিলেন। কিন্তু সামরিক বাহিনী ও ভূতাত্ত্বিকদের সমন্বয়ে চালানো খননকার্যে শেষ পর্যন্ত কোনো ট্রেনের অস্তিত্ব মেলেনি। এর পরিবর্তে পাওয়া গিয়েছিল প্রাকৃতিক শিলাস্তর এবং ভূগর্ভস্থ জলের প্রবাহ, যা রাডার ইমেজিংকে বিভ্রান্ত করেছিল।
মিথ আর বাস্তবের দোলাচলে
আজ অবধি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না মিললেও নাৎসি স্বর্ণের ট্রেনের অস্তিত্ব একেবারে উড়িয়ে দেন না একদল ইতিহাস অনুরাগী। তাদের মতে, নাৎসিরা যে পরিমাণ সোনা ও শিল্পকর্ম ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লুণ্ঠন করেছিল, তার বড় একটি অংশ আজও নিখোঁজ। তাই আউল পর্বতমালার গহীন অরণ্যে ঢাকা সুড়ঙ্গগুলো আজও রহস্যপ্রেমীদের কাছে এক অনন্ত অ্যাডভেঞ্চারের হাতছানি। স্বর্ণের সেই ট্রেনটি হয়তো কোনো গোপন প্রকোষ্ঠে মাটির কয়েকশ ফুট নিচে আজও অপেক্ষা করছে ইতিহাসের নতুন কোনো মোড়ের জন্য।