জাপানের ওটসুচি শহরের এক পাহাড়ের চূড়ায় স্থাপিত একটি সাদা রঙের টেলিফোন বুথ আজ বিশ্বজুড়ে শোকাতুর হৃদয়ের পরম আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ টেলিফোন নয়, এর সাথে কোনো বৈদ্যুতিক তার বা নেটওয়ার্কের সংযোগ নেই। তবুও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এখানে আসেন তাদের প্রিয়জনদের সাথে কথা বলতে, যারা আর এই পৃথিবীতে নেই। বাতাসের মাধ্যমে না বলা কথাগুলো পরপারে পৌঁছে দেওয়ার এই আবেগময় মাধ্যমটিই ইতিহাসে ‘উইন্ড ফোন’ বা ‘কাজ জানো ডেনওয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। একজন আন্তর্জাতিক গবেষক ও ফিচার লেখক হিসেবে এই বিমূর্ত অনুভূতির বাস্তব রূপরেখা নিয়ে সাজানো হলো আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।
নিঃশব্দ যোগাযোগের এক অদ্ভুত সূচনা
উইন্ড ফোনের জন্মকাহিনী কোনো সরকারি প্রকল্প বা যান্ত্রিক উদ্ভাবন থেকে আসেনি, বরং এটি জন্ম নিয়েছে এক গভীর ব্যক্তিগত শোক থেকে। জাপানের বাগান নকশাকার ইতারু সাসাকি ২০১০ সালে তার এক প্রিয় কাজিনকে হারানোর পর এই ধারণাটি প্রথম বাস্তবায়িত করেন। তিনি চেয়েছিলেন তার প্রিয়জনের সাথে কথা বলতে, কিন্তু বাস্তব পৃথিবীতে তা অসম্ভব ছিল। তাই তিনি তার বাগানে একটি পুরোনো স্টাইলের ফোন বুথ বসান এবং তার ভেতরে একটি ডিসকানেক্টেড রোটারি ফোন রাখেন। সাসাকির বিশ্বাস ছিল, তার কথাগুলো সাধারণ তারের মাধ্যমে নয়, বরং বাতাসের স্পন্দনে ভেসে পৌঁছে যাবে তার কাজিনের আত্মায়। এই ব্যক্তিগত শোকাতুর প্রচেষ্টাই পরবর্তীতে এক বৈশ্বিক সংহতির প্রতীকে রূপ নেয়।
২০১১ সালের সুনামি ও এক জনাকীর্ণ গন্তব্য
উইন্ড ফোনের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায় ২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানে আঘাত হানা ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির পর। সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রায় ১৯,০০০ মানুষ প্রাণ হারান এবং ওটসুচি শহরটি প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সাগরের উত্তাল ঢেউ যাদের স্বজনদের কেড়ে নিয়েছিল, তাদের জন্য এই ফোন বুথটি হয়ে ওঠে এক পরম সান্ত্বনার জায়গা। মানুষ দলবেঁধে এই পাহাড়ের চূড়ায় আসতে শুরু করেন শুধু সেই কালো রঙের ফোনটির রিসিভার তুলে ধরে একটু কথা বলার জন্য। যাদের দেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি কিংবা যাদের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগটুকুও মেলেনি, তাদের শোকার্ত স্বজনরা এই ফোনের মাধ্যমেই মনের জমে থাকা সব কথা উগরে দিতে শুরু করেন।
বাতাসের মাধ্যমে বার্তা প্রেরণের গভীর দর্শন
উইন্ড ফোন বা ‘কাজ জানো ডেনওয়া’ নামকরণের পেছনে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শন। জাপানি সংস্কৃতিতে প্রকৃতির সাথে আত্মার এক নিবিড় সম্পর্ক কল্পনা করা হয়। ইতারু সাসাকি মনে করেন, মানুষের শব্দ বা আবেগ যখন মুক্ত বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন বাতাস তা বহন করে নিয়ে যায় অজানার উদ্দেশ্যে। এখানে কোনো যান্ত্রিক সংযোগ নেই কারণ বিচ্ছেদ হওয়া আত্মার সাথে কথা বলার জন্য কোনো কৃত্রিম নেটওয়ার্কের প্রয়োজন পড়ে না। যারা এই বুথে আসেন, তারা রিসিভার তুলে ডায়াল প্যাডে প্রিয়জনের ফোন নম্বরটি ঘোরান এবং তারপর কেবল কথা বলে যান। সেই একপাক্ষিক কথোপকথনে কখনও থাকে অভিযোগ, কখনও ভালোবাসা, আর কখনও শুধুই কান্নার শব্দ।
শোক কাটিয়ে ওঠার এক মনস্তাত্ত্বিক থেরাপি
মনোবিজ্ঞানীরা উইন্ড ফোনকে একটি শক্তিশালী ‘গ্রিফ থেরাপি’ বা শোক নিরাময় প্রক্রিয়া হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাধারণত মৃত্যু পরবর্তী শোক কাটিয়ে উঠতে মানুষের মনের অব্যক্ত কথাগুলো প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় মানুষ সরাসরি কারো কাছে নিজের দুর্বলতা বা দীর্ঘশ্বাস প্রকাশ করতে পারে না। উইন্ড ফোনের নির্জন বুথটি তাদের সেই গোপনীয়তা এবং স্বাধীনতা দেয়। ফোনের ওপাশে কেউ উত্তর দিচ্ছে না জেনেও কথা বলাটা মানুষের মস্তিষ্ককে মেনে নিতে সাহায্য করে যে প্রিয়জনটি আর নেই, কিন্তু তার সাথে স্মৃতি এবং ভালোবাসার যোগসূত্রটি এখনও অটুট। এটি অবদমিত আবেগকে মুক্তি দেওয়ার একটি নিরাপদ পথ হিসেবে কাজ করে।
বৈশ্বিক বিস্তার ও সংহতির প্রতীক
জাপানের এই ছোট্ট পাহাড়ি গ্রামের সাদা ফোন বুথটি এখন আর কেবল জাপানেই সীমাবদ্ধ নেই। এই হৃদয়স্পর্শী ধারণার অনুপ্রেরণায় বর্তমানে আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উইন্ড ফোন স্থাপিত হয়েছে। প্রতিটি দেশেই এর উদ্দেশ্য একই— বিয়োগান্তক শোককে একাকী বয়ে না বেড়িয়ে প্রকৃতির মাঝে বিলীন করে দেওয়া। এটি প্রমাণ করে যে মানুষের শোকের ভাষা বৈশ্বিক এবং প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা সীমানাহীন। গবেষকদের মতে, যান্ত্রিক এই যুগে যেখানে সবকিছুই দ্রুতগামী এবং দৃশ্যমান, সেখানে উইন্ড ফোনের মতো একটি অকেজো যন্ত্র মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল তন্ত্রীতে আঘাত করতে সক্ষম হয়েছে।
সময়ের পরীক্ষায় অটুট: ওটসুচির মূল উইন্ড ফোন
জাপানের আইওয়াতে প্রিফেকচারের বেল গার্ডিয়া বাগানে অবস্থিত মূল ‘উইন্ড ফোন’ বা ‘কাজ জানো ডেনওয়া’ আজও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। এটি কেবল সচলই নয়, বরং দিন দিন এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ এখনও সেই সাদা রঙের ফোন বুথে যান। বিশেষ করে ২০১১ সালের সেই ভয়াবহ সুনামির স্মৃতি যখনই ফিরে আসে, ওটসুচির পাহাড়ের এই শান্ত স্থানটি কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে। বাগানটির প্রতিষ্ঠাতা ইতারু সাসাকি এবং তার স্ত্রী এটি অত্যন্ত যত্নের সাথে রক্ষণাবেক্ষণ করেন। তারা এটিকে একটি আধ্যাত্মিক সম্পদ হিসেবে গণ্য করেন যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শোকাতুর মানুষকে সান্ত্বনা দিয়ে যাবে।