রমজান মাস এলেই বদলে যায় চারপাশের চেনা দৃশ্যপট। রোজার সংযমে কাটানো দিনের শেষে সূর্য অস্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার, মাগরিবের নামাজ আর তার পরপরই শুরু হয় এক অনন্য পবিত্র আবহ। শহর থেকে গ্রাম— সারা মুসলিম উম্মাহ যেন প্রবেশ করে এক ভিন্ন আধ্যাত্মিক জগতে। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এশার আজান ভেসে আসে বাতাসে, আর মসজিদগুলো আলোয় ঝলমল করে ওঠে। ঠিক তখনই রমজানের রাত্রিকে আরও অর্থবহ করে তোলে বিশেষ এক ইবাদত— তারাবি নামাজ।
রমজান মাসে এশার চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত সুন্নতের পর এবং বিতর নামাজের আগে যে দীর্ঘ নামাজ দুই রাকাত করে আদায় করা হয়, সেটিই তারাবি নামাজ। ‘তারাবি’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘তারাবিহ’ থেকে, যার মূল অর্থ বিশ্রাম বা আরাম। এই নামাজে প্রতি দুই বা চার রাকাত পরপর কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়া হয়। দোয়া, তসবিহ ও আল্লাহর স্মরণে এই বিরতিগুলো তারাবি নামাজকে করে তোলে আরও স্নিগ্ধ ও প্রশান্তিময়।
ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে তারাবি নামাজ সুন্নাতে মুয়াক্কাদা— অর্থাৎ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আদায়যোগ্য একটি সুন্নত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেও রমজানের রাত্রিতে তারাবি নামাজ আদায় করেছেন। তবে তিনি নিয়মিত জামাতে অংশ নেননি, কারণ উম্মতের ওপর এটি ফরজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিলেন। এরপরও তিনি উম্মতকে তারাবি নামাজের প্রতি বিশেষভাবে উৎসাহিত করেছেন।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং পরকালের প্রতিদানের আশায় রমজানের রাতে কিয়ামুল লাইল— অর্থাৎ তারাবি নামাজ আদায় করে, তার অতীতের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এ কারণেই রমজানের রাতকে বলা হয় আত্মশুদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ।
তারাবি নামাজের সঙ্গে কোরআন খতম করার একটি প্রচলিত রীতি রয়েছে। যদিও হাদিসে এর বাধ্যবাধকতার কথা নেই, তবে রমজান মাসে কোরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করার বিষয়টি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমল দ্বারা প্রমাণিত। রমজান, কোরআন এবং রাতের ইবাদত— এই তিনটি যেন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।
তবে মনে রাখতে হবে, খতম তারাবি মর্যাদার বিষয় হলেও তা বাধ্যতামূলক নয়। অসুস্থতা, দুর্বলতা বা অন্য কোনো অপারগতার কারণে খতম সম্পন্ন না হলেও তারাবি নামাজের সওয়াব কমে যায় না। ইসলামের শিক্ষা হলো সহজতা ও সহনশীলতা— কঠোরতা নয়।
রমজান আমাদের শেখায় ধৈর্য, সহমর্মিতা এবং পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা। এই পবিত্র মাসে তারাবির প্রতিটি সিজদা হোক আত্মশুদ্ধির পথে এক একটি দৃঢ় পদক্ষেপ।